Deprecated: Function WP_Dependencies->add_data() was called with an argument that is deprecated since version 6.9.0! IE conditional comments are ignored by all supported browsers. in /home/u102988081/domains/dailyswadhinsangbad.com/public_html/wp-includes/functions.php on line 6260
সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতা: ফেসবুকারদের দৌরাত্ম্যে পেশাটির মর্যাদা প্রশ্নের মুখে - দৈনিক স্বাধীন সংবাদ

সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতা: ফেসবুকারদের দৌরাত্ম্যে পেশাটির মর্যাদা প্রশ্নের মুখে

ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি:

সাংবাদিকতা একটি মহান ও সম্মানজনক পেশা। সমাজের অসংগতি, অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ ও মানুষের অধিকারবঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে জনগণের সামনে সত্য প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একটি সংবাদপত্রকে বলা হয় জাতির দর্পণ, আর সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক। তাই সাংবাদিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পেশায় সততা, বস্তুনিষ্ঠতা, পেশাগত দক্ষতা এবং জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের সুযোগ নিয়ে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে এক শ্রেণির ব্যক্তি ও সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। হাতে মাইক্রোফোন, গলায় বা বুকে সংবাদমাধ্যমের লোগো, সঙ্গে একটি ক্যামেরা—এভাবেই অনেককে নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে লেখালেখি ও ভিডিও প্রকাশ করেই নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত করছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা তুলে ধরা বা নাগরিক সাংবাদিকতার চর্চা করা অবশ্যই আলাদা বিষয়। তবে শুধু একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করা, মাইক্রোফোনে কোনো প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার করা কিংবা সাংবাদিকতার স্টিকার লাগানোই একজন ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে না। এ জায়গাতেই সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতার পার্থক্য স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

একজন পেশাদার সাংবাদিককে সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, একাধিক পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা এবং বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ উপস্থাপনের মতো পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হয়। একটি সংবাদ প্রকাশের আগে ঘটনার সত্যতা যাচাই করা সাংবাদিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ একজন সাংবাদিকের প্রকাশিত সংবাদ কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সমাজের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে অভিযোগ উঠছে, কিছু অসাধু ব্যক্তি ও চক্র সাংবাদিকতার পরিচয়কে পুঁজি করে বিভিন্ন এলাকায় ‘সাংবাদিকতার কার্ড’, পরিচয়পত্র ও প্রশিক্ষণের নামে অর্থ আদায় করছে। বিভিন্ন অনলাইন বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ইউনিয়ন, থানা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার প্রকৃত কাঠামো, সংবাদমাধ্যমের নিয়োগপ্রক্রিয়া কিংবা পেশাগত যোগ্যতার বিষয়গুলো স্পষ্ট না করেই বিভিন্ন ব্যক্তিকে সাংবাদিক পরিচয়পত্র দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত সাংবাদিকদের পাশাপাশি নানা ধরনের সুবিধাবাদী ও অপেশাদার ব্যক্তিও সাংবাদিক পরিচয়ে মাঠে নামছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ধরনের প্রবণতা শুধু সাংবাদিকতা পেশার ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং সাধারণ মানুষের কাছেও প্রকৃত সাংবাদিকদের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে মাইক্রোফোন হাতে উপস্থিত হয়ে ভিডিও ধারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রচার কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা চাওয়ার অভিযোগও মাঝেমধ্যে সামনে আসে। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পেশাদার সাংবাদিকতার কোনো সম্পর্ক থাকলে তা পুরো পেশার জন্যই বিব্রতকর।

সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো সত্য ও জনস্বার্থ। একজন সাংবাদিক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে-বিপক্ষে নয়; বরং সত্য তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরাই তার দায়িত্ব। সংবাদে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া, তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় নথি পর্যালোচনা করা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির অংশ।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অভিযোগ বা তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রকাশ করলে তা গুজব, বিভ্রান্তি কিংবা মানহানিকর প্রচারণায় পরিণত হতে পারে। একটি ভুল সংবাদ যেমন একজন নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি করতে পারে, তেমনি সত্য ঘটনা যাচাই করে প্রকাশ করা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা প্রতিদিন নানা ঝুঁকি ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। দুর্গম এলাকায় গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া এবং সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সংবাদ প্রকাশ করা তাদের নিয়মিত কাজ। অথচ কিছু ব্যক্তির অপেশাদার কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো সাংবাদিক সমাজকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে।

সাংবাদিকতার নামে পরিচয়পত্র বাণিজ্য, অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিক তৈরির প্রবণতা এবং মাইক্রোফোন-লোগো ব্যবহার করে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত সংবাদমাধ্যমগুলোরও তাদের প্রতিনিধি নিয়োগ ও পরিচয়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

সচেতন মহলের মতে, সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদা রক্ষায় প্রকৃত সাংবাদিকদের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, সংশ্লিষ্ট সংগঠন এবং সরকারি কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সাংবাদিকতার পরিচয় যেন ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়, প্রভাব বিস্তার কিংবা অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

সাংবাদিকতা কোনো শখের পরিচয় নয়; এটি একটি দায়িত্বশীল পেশা। সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে যেমন স্বাধীনতা জড়িত, তেমনি এর সঙ্গে রয়েছে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় প্রত্যেক ব্যক্তিকে সাংবাদিক হিসেবে চিহ্নিত না করে পেশাদার সাংবাদিকতা ও নাগরিক সাংবাদিকতার পার্থক্য বোঝা জরুরি।

অন্যদিকে, যারা সাংবাদিকতার নামে পরিচয়পত্র বা প্রশিক্ষণের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সবশেষে বলা যায়, ভেজাল ও অপেশাদারিত্বের কারণে সাংবাদিকতার মতো মহান পেশার ভাবমূর্তি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে দায়িত্ব শুধু সাংবাদিকদের নয়—সংবাদমাধ্যম, পাঠক, দর্শক, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং পুরো সমাজের। সত্য, ন্যায়, বস্তুনিষ্ঠতা ও জনস্বার্থকে সামনে রেখে সাংবাদিকতার চর্চাই পারে এই পেশার হারানো মর্যাদা আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *