সাতকানিয়ায় এক ঠিকাদারের পাহাড় কাটার অপরাধে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

স্টাফ রিপোর্টার:

দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কোটি টাকার বরাদ্দ। মাঠে চলছে স্পিলওয়ে পুনর্নির্মাণের কাজ। সেই কাজের আড়ালে প্রকাশ্যেই কাটা হচ্ছে পাহাড়। ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পাহাড়ের মাটি।

উপজেলার সোনাইছড়ি এলাকায় চলমান একটি সরকারি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এখন এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। বরং সরকারি প্রকল্পেই ব্যবহার করা হচ্ছে পাহাড় কেটে নিয়ে আসা মাটি। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ ভূমিধসের ঝুঁকি।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মাজেদ এন্টারপ্রাইজ’ দিনের পর দিন পাহাড় কেটে মাটি নিয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ‘সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় সাতকানিয়ার সোনাইছড়ি উপ-প্রকল্পে স্পিলওয়ে পুনর্নির্মাণ কাজ’ বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাজেদ এন্টারপ্রাইজ।

প্রকল্পটির প্যাকেজ নম্বর এসপি–২৫২৫৬ এবং টেন্ডার আইডি ১০৪০৯৪৩। সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ১ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার ৮৮৪ টাকা ৭৫ পয়সা। কাজ শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি। আগামী ২৯ মে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথাও রয়েছে।

কিন্তু প্রকল্পের অগ্রগতির পাশাপাশি এখন আলোচনায় এসেছে আরেকটি বিষয়—কাজে ব্যবহৃত মাটির উৎস। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ মাটি আশপাশের পাহাড় কেটে সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সোনাইছড়ি এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক সপ্তাহ ধরেই পাহাড় কাটার কার্যক্রম চলমান। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত স্কেভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে ডাম্পার ট্রাকে মাটি তোলা হয়। পরে সেই মাটি নিয়ে যাওয়া হয় সরকারি প্রকল্প এলাকায়।

পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড় শুধু মাটির ঢিবি নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পাহাড় কাটা হলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং বৃষ্টির সময় ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

চট্টগ্রাম নগরীতে অতীতে পাহাড় ধসের ঘটনায় বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত পাহাড় কাটার কারণেই এসব দুর্ঘটনা বাড়ছে।

স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, সোনাইছড়ি এলাকায় যেভাবে পাহাড়ের ঢাল কেটে মাটি নেওয়া হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

সোনাকানিয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিন বলেন, “সোনাইছড়ি এলাকায় পাহাড় কেটে মাটি উন্নয়ন প্রকল্পে নেওয়ার বিষয়টি জেনে ঘটনাস্থলে গিয়েছি। ঠিকাদারের লোকজন পাহাড় কাটা মাটি ট্রাকে করে তাদের কাজে ব্যবহার করেছে। এ জন্য আমি তাদের বকাবকি করেছি। তারা বলেছেন, স্থানীয় লোকজন নাকি তাদের ধসে পড়া মাটি স্কেভেটর দিয়ে সরিয়ে দিতে বলেছেন। এ জন্য তারা এ কাজ করেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান স্যারকে জানিয়েছি।”

এ বিষয়ে এলজিইডির সাতকানিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে বলেন, “ঠিকাদার পার্শ্ববর্তী জমি থেকে মাটি নিতে পারবেন, কিন্তু পাহাড় কেটে মাটি ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। আমি ওই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। ইতোমধ্যে সাতকানিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট শামসুজ্জামান সরেজমিনে গিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “মূলত প্রশাসনের নজর এড়িয়ে তারা এই কাজ করেছে।”

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রুকন উদ্দীন রুবেল জানিয়েছেন, “আমি সরেজমিনে গিয়েছিলাম। এখানে এলজিইডি কিংবা উপজেলা প্রশাসনের কারও আস্কারা নেই। মূলত সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে এই কাজ চালাচ্ছেন ঠিকাদার।”

ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, “সরকারি বা বেসরকারি—কোনো প্রকল্পেই পাহাড়ের মাটি ব্যবহার করা যাবে না। পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে যেকোনো সময় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *