আব্দুল আজিজ আল মাক্কী:
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেরানীহাটের উত্তরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) জায়গায় সী-ওয়ার্ল্ডের সামনের মাঠ প্রাঙ্গণ ও ভবনের নিচতলায় অনুমোদন ছাড়া একটি দেশীয় পণ্য ও উদ্যোক্তা মেলার নামে বাণিজ্য মেলা পরিচালিত হতে দেখা গেছে গত ১০ দিন ধরে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন ও থানা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার কারণেই কয়েক দিন ধরে প্রকাশ্যে অনুমোদনহীন মেলা চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৩ অক্টোবর কেরানীহাট সী-ওয়ার্ল্ডে বাণিজ্য মেলাটি উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ জসিম উদ্দিন আহমেদ। সেই দিন থেকে পরিচালিত মেলার কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ও কেরানীহাট-বান্দরবান জেলা মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এতে সাধারণ যাত্রী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, সামনেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক পরীক্ষা। ঠিক এই সময় মেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি মেলায় আগত মানুষের কারণে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমনকি সড়ক দুর্ঘটনার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যায় মলভীর দোকান হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় দুই পরিবারের ছয় সদস্য কেরানীহাট বাণিজ্য মেলায় যাওয়ার সময় মিনিবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন নিহত হন। এ ঘটনায় চালকসহ আটজন আহত হন। এ ছাড়া দুর্ঘটনার কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দীর্ঘ তিন ঘণ্টা অবরোধ ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, প্রশাসনের অনুমতি না থাকলে এত বড় আয়োজন দিনের পর দিন চলতে পারে না। তাঁদের অভিযোগ, আয়োজকেরা ইউএনও ও ওসিকে ‘ম্যানেজ’ করেছেন বলেই কোনো অভিযান হচ্ছে না। এ কারণে অবৈধ বাণিজ্য মেলা বন্ধের উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না।
এ ছাড়া গোপন সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে মেলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে বছরের পর বছর যানজটে ভোগান্তিতে থাকা কেরানীহাটের উত্তর পাশে সী-ওয়ার্ল্ড রেস্টুরেন্টে দূরপাল্লার বাস থামিয়ে যাত্রাবিরতি দেওয়ার কারণে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে অসংখ্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ভোগান্তিতে পড়েন।
কেরানীহাট প্রগতিশীল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক সহসভাপতি আবছার বলেন, পাঁচ কোটি টাকার ডাকের কেরানীহাট বাজারে প্রতিদিনই যানজট লেগে থাকে। এর পাশাপাশি গরুর বাজারের মাত্র ৩০ গজ সামনে সী-ওয়ার্ল্ড রেস্টুরেন্ট অবস্থিত। তার ওপর চলছে অনুমোদনহীন বাণিজ্য মেলা। দিনরাত দূরপাল্লার বাস উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে এসে যাত্রাবিরতির জন্য ধীরগতিতে পার্কিং করতে থামলেই সৃষ্টি হচ্ছে সীমাহীন যানজট। এতে স্থানীয় জনগণ, অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন।
তিনি আরও বলেন, যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ সী-ওয়ার্ল্ড রেস্টুরেন্ট। এ ধরনের রেস্টুরেন্ট কেরানীহাট থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সরিয়ে নেওয়া উচিত।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা বলেন, কোনো বাণিজ্য মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও জননিরাপত্তার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি। এসব শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা প্রশাসনের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এদিকে কয়েক দিন আগে কেরানীহাট এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা মহাসড়কের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলেও একই এলাকায় অনুমোদনহীন মেলা চলতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা শত শত ভাসমান ব্যবসায়ীও বেকারত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের ভাষ্য, একদিকে যানজট নিরসনের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে যানজটের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠা অনুমোদনহীন মেলার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
এ বিষয়ে কেরানীহাট প্রগতিশীল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি বলেন, বাণিজ্য মেলা কেরানীহাট বাজার কমিটির আওতায় হলেও তাঁদের কাছ থেকে কোনো ধরনের অনুমতি নেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, কেঁওচিয়া ইউনিয়নের আশপাশে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। কয়েক দিন পরই বার্ষিক পরীক্ষা। এ সময় মেলার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় চরম ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি এলাকার নারী-পুরুষের অবাধ চলাচল, সামাজিক পরিবেশ ও নানা অনিয়ম নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ভবনের ওপরেই একটি কোরআন হাফেজি মাদ্রাসা রয়েছে। বাণিজ্য মেলা করতেই হলে ডিসেম্বরের পর অন্য কোনো স্থানে আয়োজন করা উচিত। সী-ওয়ার্ল্ড রেস্টুরেন্টের কারণেও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহসিনের কাছে মেলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কি না, তা জানতে কয়েকবার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. জাহেদুল ইসলাম মিয়াঁর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া এসএমএস পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীব দাশ পুরকায়স্থের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জেলা প্রশাসনের অনুমতি নাই। উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার নাই।”