আব্দুল আজিজ:
সাতকানিয়া উপজেলায় এক নারীসহ চার সদস্যের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে স্থানীয় জনতার হাতে আটক হওয়ার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার ভিন্নধর্মী মোড় এনে দিয়েছে ধর্ষণচেষ্টার পাল্টা অভিযোগ, যা পুরো ঘটনাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
জানা যায়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ১০ নম্বর কেঁওয়াচিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মাস্টারপাড়া এলাকায় সাপের চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত সজল কান্তি দাশের বাড়িতে শুক্রবার জুমার নামাজের পরপরই এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে ইয়াসমিন আক্তার নামে এক নারী রোগীর পরিচয়ে চিকিৎসা নেওয়ার অজুহাতে সজল বৈদ্যের বাড়িতে প্রবেশ করেন। কিছু সময় পর তিনি কৌশলে সজল কান্তি দাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেন এবং তার সঙ্গে থাকা একটি ব্যাগে গোপনে ক্যামেরা স্থাপন করে ভিডিও ধারণের প্রস্তুতি নেন বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে নূরুল আবছারসহ আরও দুইজন ওই ঘরে প্রবেশ করে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সজল কান্তি দাশকে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করে এবং ধারণ করা ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে।
ভুক্তভোগী সজল কান্তি দাশ দাবি করেন, তিনি মানসম্মানের কথা বিবেচনা করে প্রথমে ১০ হাজার টাকা দিতে রাজি হলেও চক্রটি কোনোভাবেই দুই লাখ টাকার কমে রাজি হচ্ছিল না এবং বারবার হুমকি দিচ্ছিল। এদিকে ঘটনাটি সন্দেহজনক মনে হলে সজল বৈদ্যের পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় লোকজনকে খবর দিলে দ্রুত এলাকাবাসী ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে অভিযুক্তদের আটক করে। আটক করার সময় চক্রের সদস্যরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয়রা তাদের হাতেনাতে ধরে ফেলে এবং উত্তেজিত জনতা তাদের গণপিটুনি দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে স্থানীয় সংবাদকর্মী ও পুলিশের সহায়তায় অভিযুক্তরা গুরুতর আঘাত থেকে রক্ষা পায়।
পরে সাতকানিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সজল কান্তি দাশসহ ওই নারীসহ চার সদস্যকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। আটক ব্যক্তিরা হলেন বাঁশখালী উপজেলার চন্দ্রপুর এলাকার নূরুল আবছার, পটিয়া উপজেলার সুবলদণ্ডী এলাকার ইয়াসমিন আক্তার, বাঁশখালীর পূর্ব গুনাগুরি এলাকার জাহাঙ্গীর আলম এবং আনোয়ারা উপজেলার বারকানিয়া এলাকার জয়নাল উদ্দিন। স্থানীয়দের দাবি, তারা কোনো স্বীকৃত গণমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত নন এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় সাংবাদিক পরিচয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করতেন।
তবে ঘটনার ভিন্ন দিক তুলে ধরে আটক নারী ইয়াসমিন আক্তার দাবি করেন, তিনি পূর্বে চিকিৎসার জন্য ওই বৈদ্যের কাছে গিয়েছিলেন এবং সেসময় তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, পুনরায় প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গেলে সেদিনও সজল কান্তি দাশ তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন, যার প্রমাণ রাখতে তিনি গোপনে ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন। অন্যদিকে সজল কান্তি দাশ এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, তাকে ফাঁসানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে এই চক্রটি কাজ করেছে এবং চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যেই তারা এমন নাটক সাজিয়েছে। সজল কান্তির স্ত্রীও দাবি করেন, চক্রটি প্রথমে দুই লাখ টাকা দাবি করে এবং পরে ১০ হাজার টাকা নিয়েও সন্তুষ্ট হয়নি, বরং আরও টাকা দাবি করতে থাকে।
তিনি জানান, বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা স্থানীয়দের সহায়তা চান এবং এলাকাবাসী দ্রুত এসে অভিযুক্তদের আটক করে। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটি একটি সুপরিকল্পিত চাঁদাবাজির অংশ এবং ধর্ষণের অভিযোগটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন। তারা বলেন, বিভিন্ন উপজেলা থেকে এসে এমন একটি চক্র নিরিবিলি এলাকায় প্রবেশ করে গোপন ক্যামেরা ব্যবহার করে মানুষকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
তারা এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এদিকে থানায় নেওয়ার পর জানা যায়, অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে নিতে চট্টগ্রাম থেকে কয়েকজন ব্যক্তি থানায় আসেন এবং উভয় পক্ষের মধ্যে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করেন। তারা বলেন, সমঝোতা না হলে নারী সদস্য ধর্ষণের মামলা করবেন। তবে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং কোনো পক্ষকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সাতকানিয়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, শনিবার সকালে আটক চার সদস্য ও সজল কান্তি দাশের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ঘটনাটির প্রকৃত সত্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে, পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি এবং পাল্টা গুরুতর অভিযোগের মতো ঘটনা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে এবং প্রকৃত সাংবাদিকতার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। তারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।