সালমান শাহ হত্যা মামলা ডনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর

নিজস্ব প্রতিবেদক:

চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-৬-এর বিচারক তাওহীদা আক্তার শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

ডনের পক্ষে তাঁর আইনজীবী সফিউল ইসলাম জামিনের আবেদন জানিয়ে শুনানি করেন। শুনানি শেষে আদালত আবেদনটি নাকচ করে দেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন।

এর আগে গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাঁকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়। ওই দিনই তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া

চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় সে সময় অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ তুলে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের আবেদন করেন তিনি।

অপমৃত্যুর ঘটনা ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের জন্য আদালত সিআইডিকে নির্দেশ দেন। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন।

তবে সিআইডির প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হয়ে সালমান শাহর বাবা রিভিশন মামলা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলাটি পরিচালনা করছেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর।

সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলাটি দায়ের করেন মোহাম্মদ আলমগীর।

মামলায় সামীরাসহ ১১ জনের নাম

মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

অন্য আসামিরা হলেন শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, আশরাফুল হক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বাদী মোহাম্মদ আলমগীর অভিযোগ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর বোন নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), বোনের স্বামী কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং তাঁদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহর সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন।

এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমানের কিছু হয়েছে বলে জানান। পরে পরিবারের সদস্যরা বাসায় ফিরে শয়নকক্ষে তাঁকে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। এজাহারে আরও দাবি করা হয়, হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখা যায়।

পরে তাঁকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষে পরবর্তী আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

মরদেহ উত্তোলন ও তদন্তের অগ্রগতি

এর আগে সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরবর্তী সময়ে আদালত মরদেহ উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন। এ নিয়ে বাদীপক্ষের পক্ষ থেকে আদেশ বাতিলের আবেদনও করা হয়।

পরবর্তী সময়ে দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত আদেশের অনুলিপি আদালতে দাখিলের পর তা নথিভুক্ত করা হয়।

মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৫ নভেম্বর দিন ধার্য রয়েছে। দীর্ঘদিনের আলোচিত এ মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে হত্যা মামলা দায়েরের পর তদন্তের অগ্রগতি ও আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *