এইচ এম হাকিম:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা উর্বর জনপদ চুয়াডাঙ্গা কেবল একখণ্ড ভূখণ্ড নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির এক সমৃদ্ধ প্রাণকেন্দ্র। প্রথাগত চাষাবাদ থেকে শুরু করে উচ্চমূল্যের ফলমূল, মৎস্যসম্পদ এবং ঐতিহ্যবাহী কৃষি-শিল্পের যে অভূতপূর্ব মেলবন্ধন এখানে ঘটেছে, তা দেশের অন্য যেকোনো জেলার জন্য এক উজ্জ্বল ও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। ভৌগোলিক অবস্থান, অনুকূল আবহাওয়া এবং পলিভেজা উর্বর মাটির কল্যাণে চুয়াডাঙ্গাকে অনায়াসেই দেশের অন্যতম ‘কৃষি রাজধানী’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। এখানকার কৃষকদের মেধা, হাড়ভাঙা খাটুনি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সার্থক প্রয়াসের মাধ্যমে এ জেলা প্রতিনিয়ত জাতীয় অর্থনীতিতে বিপুল অবদান রেখে চলেছে। সুস্বাদু আম যেমন—হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি এবং পুষ্টিগুণসম্পন্ন ড্রাগন ফল উৎপাদনে চুয়াডাঙ্গা আজ জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষস্থান অধিকার করে আছে। এ জেলার ড্রাগন ও আম দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা চমৎকারভাবে মিটিয়ে এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও সুনামের সঙ্গে রপ্তানি হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। কেবল আম কিংবা ড্রাগন ফলেই চুয়াডাঙ্গার সফলতা সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভুট্টা, কলা, পেয়ারা, ধানের বাম্পার ফলন, পাটের বাণিজ্যিক উৎপাদন এবং শীতকালীন নানাবিধ সবজি উৎপাদনে প্রতিবছর চুয়াডাঙ্গা রেকর্ড পরিমাণ সাফল্য অর্জন করছে।
কৃষির এই অভূতপূর্ব অগ্রযাত্রার পাশাপাশি প্রোটিনের চাহিদা পূরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও এ জেলা ঘটিয়েছে এক নিরবচ্ছিন্ন নীরব বিপ্লব। ভৈরব, মাথাভাঙ্গা ও বেগবতী নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে কার্পজাতীয় মাছ, পাবদা, গুলশা এবং বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছের বাণিজ্যিক চাষ ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বখ্যাত ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট’ বা কালো ছাগলের মূল প্রজননক্ষেত্র হিসেবে চুয়াডাঙ্গার সুখ্যাতি সারা দেশজুড়ে। এখানকার খামারভিত্তিক পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের বিকাশ স্থানীয় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি জাতীয় আমিষের ঘাটতি পূরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। চুয়াডাঙ্গার মিষ্টি পানের কথা না বললেই নয়; ঐতিহ্যবাহী এই পানের বরজগুলো এ জেলার হাজারো পরিবারের জীবিকার প্রধান স্তম্ভ এবং এই সুস্বাদু পান দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও অত্যন্ত কদরের সঙ্গে রপ্তানি হয়ে থাকে।
চুয়াডাঙ্গার কৃষি-শিল্পের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী স্মারক হলো দর্শনায় অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘কেরু অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড’। চিনি কল ও ডিস্টিলারির পাশাপাশি কেরু অ্যান্ড কোম্পানির নিজস্ব বিশাল কৃষি বিভাগ এ অঞ্চলের কৃষি গবেষণার এক অনন্য ও ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির শত শত একর নিজস্ব কৃষিখামার এবং চুক্তিভিত্তিক আখ চাষের ব্যবস্থা আধুনিক জাত উদ্ভাবন, মৃত্তিকার গুণাগুণ সংরক্ষণ এবং খামার ব্যবস্থাপনায় যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা দেশের কৃষি-শিল্পের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। আখের পাশাপাশি কেরু অ্যান্ড কোম্পানির উদ্ভাবিত জৈব সার উৎপাদন এবং কৃষিভিত্তিক বর্জ্যের সঠিক ও পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহারের কার্যকর মডেল প্রমাণ করে যে, চুয়াডাঙ্গার মাটি কেবল শস্য ফলায় না, বরং এটি উচ্চতর গবেষণার জন্য এক অত্যন্ত চমৎকার প্রাকৃতিক উর্বর ক্ষেত্র।
এ ছাড়া ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবকাঠামোর দিক থেকেও চুয়াডাঙ্গা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও সুসংগঠিত। দর্শনা-জয়নগর স্থল ও রেলবন্দর ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার আন্তর্জাতিক সীমান্ত বাণিজ্যকে দারুণভাবে বেগবান করেছে, যা প্রতিবছর জাতীয় রাজস্বে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা যোগ করে। ঢাকা, খুলনা কিংবা রাজশাহীর মতো দেশের বড় বড় নগরীর সঙ্গে সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম হওয়ার কারণে এখানকার উৎপাদিত কৃষিপণ্য, ফলমূল, মাছ ও শিল্পপণ্য অত্যন্ত দ্রুত ও কম খরচে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে।
এত বিপুল বৈচিত্র্যময় কৃষি সাফল্য, দেশের শীর্ষ খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলার মর্যাদা, ঐতিহ্যবাহী কৃষি-শিল্প এবং সুবিশাল অর্থনৈতিক অবদান থাকা সত্ত্বেও দুঃখজনকভাবে আজ অবধি চুয়াডাঙ্গায় গড়ে ওঠেনি একটিও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এটি আজ আর কেবল কোনো প্রশাসনিক দাবি বা সাধারণ প্রস্তাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি কোটি চুয়াডাঙ্গাবাসীর হৃদয়ের গভীরে লালিত এক আবেগপূর্ণ ও প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। যে জেলা প্রতিনিয়ত দেশের কোটি কোটি মানুষের অন্ন জোগায়, সুস্বাদু ফলমূল ও প্রাণিজ প্রোটিনের বিশাল জোগান দেয় এবং যার বুকে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মতো শতবর্ষী কৃষি-শিল্প সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে, সেই জেলায় কোনো উচ্চতর কৃষি গবেষণাগার বা বিশ্ববিদ্যালয় না থাকা সত্যিই এক বিরাট ঐতিহাসিক অসামঞ্জস্য।
চুয়াডাঙ্গায় একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে তা কেবল শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদানের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থাকে বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক রূপ দেবে। চুয়াডাঙ্গার বিশ্বখ্যাত ড্রাগন ও আমের পচন রোধ, দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার বিকাশে এটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। ঐতিহ্যবাহী পানের মড়ক ও রোগবালাই দমন, ব্ল্যাক বেঙ্গল গোটের জিনগত বিশুদ্ধতা রক্ষা ও উন্নত প্রজনন গবেষণা এবং কেরু অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক যৌথ গবেষণার মাধ্যমে আখ চাষ ও কৃষিভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক নতুন যুগের সূচনা হবে। চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় মাটির বাস্তবতা ও কৃষকদের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই গবেষণালব্ধ জ্ঞান ভবিষ্যতে পুরো বাংলাদেশের সার্বিক কৃষিনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা কৌশল গঠনে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারবে।
চুয়াডাঙ্গার এই গৌরবময় সফলতা কোনো আকস্মিক অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি এখানকার মেহনতি কৃষকের গায়ের রক্ত পানি করা ঘাম, উর্বর মাটির অপরিমেয় প্রাচুর্য এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অদম্য সাহসের সার্থক ফসল। যে মাটি সারা দেশের পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা সুদৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করে আসছে, সেই মাটিতে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও গবেষণার আলো ছড়াতে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক দাবি। চুয়াডাঙ্গাবাসীর এই স্বপ্নের বাস্তবায়নে সরকার ও নীতিনির্ধারক মহল দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এবং মেধা, শ্রম ও উৎপাদনের এই উর্বর ভূমিতে কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার এক নতুন সূর্য উদিত হবে—এটাই আজ চুয়াডাঙ্গা জেলার সর্বস্তরের মানুষের একবুক আশা ও আকুল প্রত্যাশা।