সাংবাদিকদের দেখলেই দরজা বন্ধ করে দেন কুমিল্লার ডিসি

মোঃ আনজার শাহ:

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রোজী আক্তারের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা, সাংবাদিকদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় বসিয়ে রাখা, ফোন না ধরা এবং বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকদের (এডিসি) কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জেলা প্রশাসকের এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লায় কর্মরত একাধিক সাংবাদিক ও সাংবাদিক নেতারা।

সাংবাদিকদের অভিযোগ, সম্প্রতি বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য ও বক্তব্য নিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ভিজিটিং কার্ড পাঠানোর পর অপেক্ষায় রাখা হচ্ছে এবং পরে কোনো একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলতে বলা হচ্ছে। এমনকি জেলা প্রশাসককে ফোন করা হলেও তিনি নিজে কথা না বলে এডিসিদের দিয়ে কল রিসিভ করাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি মামলা প্রত্যাহার ও নিষ্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য জানতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন দৈনিক আমার দেশ-এর কুমিল্লা প্রতিনিধি এম হাসান।

মামলা নিষ্পত্তিতে এগিয়ে থাকা জেলাগুলোকে পুরস্কৃত করা হবে বলে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ঘোষণা দেওয়ার পর কুমিল্লায় মামলা প্রত্যাহারের সংখ্যা এবং এ বিষয়ে কতটি আবেদন হয়েছে—এসব তথ্য জানতে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান এম হাসান। তিনি জেলা প্রশাসকের বক্তব্য নেওয়ার জন্য ভিজিটিং কার্ড পাঠান।

কিছুক্ষণ পর সহকারী কমিশনার রাফিদ খান এসে জানান, জেলা প্রশাসক তাকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার জন্য দ্বিতীয়বার চেষ্টা করার অনুরোধ জানানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন ওই সাংবাদিক।

এম হাসানের ভাষ্য, গত ১৬ বছরে কুমিল্লায় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার ২০০ মামলা হয়েছে। এসব মামলা প্রত্যাহার ও নিষ্পত্তির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে দেখভাল করা হচ্ছে এবং জেলা প্রশাসক ওই কমিটির সভাপতি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য জানতে চাইলেও তিনি তা পাননি।

নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে বক্তব্য নিতে একইভাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জেলা প্রশাসকের সাক্ষাৎ না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ডিবিসির কুমিল্লা প্রতিনিধি নাসির উদ্দিন।

গত বৃহস্পতিবার তিনি নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য নিতে কার্যালয়ে যান। ভিজিটিং কার্ড পাঠানোর পর তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলা হয়। প্রায় ১০ মিনিট পর সহকারী কমিশনার রাফিদ খান এসে জানান, এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাইফুল ইসলামের বক্তব্য নিতে হবে।

নাসির উদ্দিন জেলা প্রশাসকের বক্তব্য নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি যেহেতু নারীসংক্রান্ত, তাই জেলা প্রশাসকের বক্তব্য থাকলে প্রতিবেদনটি আরও সমৃদ্ধ হবে। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জেলা প্রশাসকের কক্ষে গিয়ে ফিরে আসেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেন বলে জানান নাসির উদ্দিন। শেষ পর্যন্ত তাকে এডিসির বক্তব্য নিয়েই প্রতিবেদন করতে হয়।

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নাসির উদ্দিন বলেন, “আজকে ডিসির আচরণটা দেখলেন।”

জামায়াত নেতাদের সঙ্গেও অসহিষ্ণু আচরণের অভিযোগ

জেলা প্রশাসক রোজী আক্তারের বিরুদ্ধে শুধু সাংবাদিকদের নয়, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সঙ্গেও অসহিষ্ণু আচরণের অভিযোগ উঠেছে।

গত ৬ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর কুমিল্লা মহানগরের কয়েকজন নেতা-কর্মী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে যান বলে জানা গেছে। সেখানে জেলা প্রশাসক তাদের সঙ্গে উচ্চস্বরে ও অসহিষ্ণু আচরণ করেছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দিন মোহাম্মদের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “আওয়ামী লীগের ডিসি আর বর্তমান সরকারের ডিসি একই রকম। সরকার যেভাবে বলেন, উনারা এভাবেই চলেন।”

ফোন করেও মিলছে না বক্তব্য

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গণমাধ্যমকর্মী জানান, সম্প্রতি দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসরিন আক্তারের বিরুদ্ধে সরকারি ভবনের মালামাল লুটের অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য নিতে তাকে ফোন করেছিলেন তিনি। তবে জেলা প্রশাসক ফোন না ধরে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক)-এর সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

এমন অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক আমার দেশকে বলেন, “এর আগে কখনো কুমিল্লার কোনো জেলা প্রশাসককে এমন দেখিনি। উনি কেন এমন করছেন, সেটা উনিই বলতে পারবেন। এই বিষয়টি নিয়ে আমরা বিব্রত।”

সাংবাদিক নেতাদের ক্ষোভ

কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সদস্য ও এখন টিভির ব্যুরো প্রধান খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, “তিনি প্রশ্ন নেবেন এবং উত্তর দেবেন, যেন কোনো রকম ভুল তথ্য বা অসমাপ্ত তথ্য গণমাধ্যমে না আসে। কিন্তু তিনি গণমাধ্যমকে ব্যস্ততা দেখিয়ে এড়িয়ে চলেন। এটা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। কুমিল্লা বিপুল জনসংখ্যার একটি জনগুরুত্বপূর্ণ জেলা। এখানে গণমাধ্যমের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে অতীতে প্রশাসকরা সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তিনি সেখানে দূরত্ব বাড়াতে পারেন না।”

বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লার জমিন-এর সম্পাদক শাহাজাদা এমরান বলেন, জেলা প্রশাসক কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন না এবং কারও ফোন ধরেন না—এমন অভিযোগ একাধিক সাংবাদিক তাকে জানিয়েছেন। সাংবাদিক ছাড়াও অনেকেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, “একজন জেলা প্রশাসক জেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। তার মুখের বক্তব্য আর এডিসিদের বক্তব্য এক নয়। সাংবাদিকরা জেলা প্রশাসকের কাছে চাল-ডাল চাওয়ার জন্য যান না। জনগণের দুর্ভোগ, নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্যই তারা যান। তিনি বক্তব্য এডিসিদের কাছে রেফার করতেই পারেন, তবে যেটা তার নিজস্ব বিষয়, সেটি রেফার করা সমীচীন নয়। জেলা প্রশাসক যদি সাংবাদিকদের বক্তব্য না দেন, এটা শুধু দুঃখজনক নয়, দুর্ভাগ্যজনকও।”

কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু বলেন, সম্প্রতি যোগদান করা জেলা প্রশাসক সংবাদ সংক্রান্ত বিষয়ে বক্তব্য দিতে চান না—এমন কথা বেশ কয়েকজন সাংবাদিক জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “এই বিষয়টি যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কুমিল্লায় কর্মরত সাংবাদিকদের দূরত্ব বৃদ্ধি পাবে। যা হবে খুবই দুঃখজনক বিষয়। আমি আশা করব, জেলা প্রশাসক মহোদয় কুমিল্লায় কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলবেন এবং বক্তব্য দেবেন। দায়িত্বশীল পদে থেকে তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলতে পারেন না।”

কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও ৭১ টেলিভিশনের নিজস্ব প্রতিবেদক কাজী এনামুল হক ফারুক দৈনিক আমার দেশকে বলেন, “উনি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। আমাদের জানার বিষয়টা ওনার কাছ থেকেই। উনার কাছে গণমাধ্যমকর্মীরা বক্তব্য চাইবেন। উনি যদি না দেন, তাহলে গণমাধ্যম যাবে কার কাছে?”

তিনি আরও বলেন, এর আগে চ্যানেল ওয়ানের প্রতিনিধি সৌরভী জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলতে গেলেও তাকে বক্তব্য না দিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলামের কাছে পাঠানো হয়েছিল।

কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল হাসনাত বাবুল বলেন, “যে কোনো গণমাধ্যমকর্মী যখন জেলা প্রশাসকের বক্তব্যের জন্য যাবেন, যদি উনি ওই বিষয়টি নাও জানেন, তিনি বলে দিতে পারেন—এ বিষয়ে আমি অবগত নই। অন্তত এতটুকু বললেই হয়। দেখা না করার বিষয়টি দুঃখজনক।”

বক্তব্য পাওয়া যায়নি জেলা প্রশাসকের

গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য প্রয়োজন হলেও কেন তাদের এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে—এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক রোজী আক্তারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সাংবাদিকদের অভিযোগ, এ ধরনের ঘটনা শুধু কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে নয়; কুমিল্লায় কর্মরত আরও অনেক সাংবাদিক একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রয়োজন হয়। প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার স্বার্থে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করা জেলা প্রশাসনের দায়িত্বের অংশ।

সাংবাদিকদের প্রত্যাশা, জেলা প্রশাসক রোজী আক্তার গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *