স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। দলকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করতে এবং তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বিএনপির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দলের হাইকমান্ড সম্ভাব্য নেতাদের সাংগঠনিক দক্ষতা, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি জুন মাসের মধ্যেই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।
দলের অভ্যন্তরে ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি কার্যকর করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে এবারের কমিটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং চমক আসতে পারে বলে ধারণা করছেন নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে বর্তমান কমিটির শীর্ষ দুই পদে থাকা নেতাদের নতুন কমিটিতে রাখা হবে কি না, তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এস এম জিলানীকে সভাপতি এবং রাজীব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন বছর মেয়াদি কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব নিয়ে সংগঠনের সর্বস্তরে আগ্রহ এখন তুঙ্গে।
দলীয় সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী, সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান, জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ইয়াছিন আলী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান। ওই বৈঠকে সংগঠনের পুনর্গঠন, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন, মাঠপর্যায়ে সক্রিয় নেতৃত্বকে সামনে আনা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্ষম নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সূত্রগুলো আরও জানায়, নতুন ও পুরোনো নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কমিটি গঠনের বিষয়ে ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। এতে দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে সক্রিয় থাকা নেতাদের পাশাপাশি সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন কমিটির সভাপতি পদে যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা সাদরেজ জামান। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক দক্ষতা, তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক প্রতিকূল সময়ে মাঠে থাকার কারণে সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী তাকে সভাপতি হিসেবে দেখতে চান।
কমিটি পুনর্গঠন প্রসঙ্গে সাদরেজ জামান বলেন, “সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। যারা দীর্ঘদিন ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম, নির্যাতন ও গুমের শিকার হয়েছেন এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও রাজপথে সক্রিয় থেকেছেন, তাদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।”
সভাপতি পদে আরও যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে তারা হলেন জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ইয়াছিন আলী, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মো. জাকারিয়া আলম মামুন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম নোমান, সহ-সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন।
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান এবং যুগ্ম সম্পাদক ফয়েজউল্লাহ ফয়েজ। এছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক পদে সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহাবুদ্দিন শিকদার ডালিমের নামও জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন নেতৃত্বে ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনাও রয়েছে। সম্ভাব্যদের তালিকায় রয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদ ইকবাল খান এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল।
এ বিষয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “সারা দেশে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যেসব কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পুনর্গঠন করা হবে। সেখানে ত্যাগী, পরীক্ষিত এবং মাঠের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। তৃণমূলের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক রয়েছে এবং যারা সংগঠনকে এগিয়ে নিতে সক্ষম, তারাই কমিটিতে স্থান পাবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম নোমান বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর যারা আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলেন, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন এবং তৃণমূলকে সংগঠিত করে দলকে শক্তিশালী করার সক্ষমতা রাখেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহাবুদ্দিন শিকদার ডালিম বলেন, “১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থাকা ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাদের মূল্যায়ন করা হলে স্বেচ্ছাসেবক দল আরও শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হবে। নতুন কমিটিতে ত্যাগীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে বলে আমার প্রত্যাশা।”
যুগ্ম সম্পাদক ফয়েজউল্লাহ ফয়েজ বলেন, “মেধাবী, ত্যাগী ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নেতাদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হলে সংগঠনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।”
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, “জাতীয়তাবাদের আদর্শকে ধারণ করে দেশ ও জাতির কল্যাণে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আমরা সবসময় প্রস্তুত। দল যে দায়িত্ব দেবে, তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব।”
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন বলেন, “দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, হামলা-মামলার শিকার হয়েছি। সাংগঠনিক অভিভাবকরা যে দায়িত্ব দেবেন, তা যথাযথভাবে পালন করব।”
দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, আসন্ন কেন্দ্রীয় কমিটিতে যদি ত্যাগী, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী এবং মাঠপর্যায়ে পরীক্ষিত নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে স্বেচ্ছাসেবক দলে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি আরও সুসংহত হবে বলে মনে করছেন তারা। নতুন কমিটি ঘোষণার অপেক্ষায় এখন সংগঠনের হাজারো নেতাকর্মী।