মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একটি শ্মশানঘাটের উন্নয়নকাজ রক্ষায় আদালতে দাঁড়িয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। দীর্ঘ ৭ মাস ধরে বন্ধ থাকা শ্মশান উন্নয়ন প্রকল্প পুনরায় চালুর লক্ষ্যে তিনি আদালতে উপস্থিত হয়ে শ্মশানের পক্ষে যুক্তি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপন করেন।
বুধবার (১৭ জুন) সকাল সাড়ে ১১টায় নারায়ণগঞ্জের প্রথম যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ তাহমিনা আক্তার পিংকির আদালতে এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আম্বার পেপার মিলসের দায়ের করা মামলায় জারি হওয়া ইনজাংশন ও স্থিতাবস্থা আদেশ বাতিলের আবেদন করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ১৭৯৩ সালে সিদ্ধিরগঞ্জের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আজিবপুর এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী শ্মশানঘাট ও মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ৩১ শতাংশ জমির ওপর গড়ে ওঠা এ শ্মশানটি সিদ্ধিরগঞ্জের একমাত্র শ্মশান হিসেবে পরিচিত।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ১০ নম্বর ওয়ার্ডের পাশাপাশি সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর ও মদনগঞ্জ এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে শেষকৃত্য সম্পন্ন করে থাকেন।
সূত্র জানায়, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট দূর করতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক দাহচুল্লি, গোসলঘর এবং দ্বিতল অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়। ২০২৫ সালের ১৯ জুন কাজ শুরু হওয়ার পর ৪৮টি পাইলিং পিলার নির্মাণও সম্পন্ন হয়। তবে পরে পারটেক্স গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আম্বার পেপার মিলস হাইকোর্টে মামলা দায়ের করলে আদালতের স্থিতাবস্থা আদেশে উন্নয়নকাজ বন্ধ হয়ে যায়।
শুনানি শেষে প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, হাট-ঘাট, মাঠ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান লিজ দেওয়ার কোনো বৈধতা নেই। বিগত আমলে ফ্যাসিস্ট সরকার অবৈধভাবে এই জায়গা লিজ দেয়। প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো একটি শ্মশানের সব বৈধ কাগজপত্র ও আদালতের পূর্ববর্তী রায় থাকার পরও একটি শিল্পগোষ্ঠী হাইকোর্টে রিট করে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট উন্নয়নকাজ বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা আদালতে প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র উপস্থাপন করেছি। আশা করছি, ন্যায়বিচার পাব।
সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ১৭৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শ্মশানঘাট ও মন্দিরের অস্তিত্ব বিভিন্ন সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
সরকারি আইন অনুযায়ী মন্দির, মসজিদ, শ্মশান, রাস্তা-ঘাট বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা লিজ দেওয়া যায় না। একটি মিথ্যা দাবির ভিত্তিতে উন্নয়নকাজ আটকে রাখা হয়েছে। আদালতের রায় সত্য ও সাধারণ মানুষের পক্ষে আসবে বলে আমরা আশা করছি।
অন্যদিকে, বিবাদীপক্ষ আম্বার পেপার মিলসের আইনজীবী সময়ের আবেদন করলে আদালত পরবর্তী শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দিন নির্ধারণ করেন।
শ্মশান কমিটির সভাপতি সুভাষ চন্দ্র তরফদার জানান, ১৯৮৯ সালে পারটেক্স গ্রুপ জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ৬ দশমিক ৭৯ একর জমি বন্দোবস্ত নিলেও আবেদনে শ্মশানের ৩১ শতাংশ জমির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। পরবর্তীতে এ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে আদালত শ্মশানের পক্ষে রায় দেন। অতীতেও কয়েকবার জমি দখলের চেষ্টা হলেও স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় ও এলাকাবাসীর প্রতিরোধে তা ব্যর্থ হয়।
শ্মশান কমিটির সদস্য শিশির ঘোষ (অমর) বলেন, এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, হাজারো মানুষের শেষ বিদায়ের স্থান। মানবিক কারণে দ্রুত উন্নয়নকাজ শেষ হওয়া জরুরি।
আম্বার পেপার মিলসের ইনচার্জ নজরুল ইসলাম বলেন, শ্মশানে দাহ কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে এবং আদালতের নির্দেশনা মূলত ভবন নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়ে প্রযোজ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতায় আটকে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি করে উন্নয়নকাজ পুনরায় শুরুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সব ধর্মের মানুষের প্রত্যাশা, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এ বিরোধের অবসান ঘটবে এবং সিদ্ধিরগঞ্জের প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো শ্মশানঘাট আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন অবকাঠামো পাবে।