স্টাফ রিপোর্টার:
বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ঘুষ, কমিশন বাণিজ্য, দরপত্রে অনিয়ম, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন সাকিল আহম্মেদ নামে এক ব্যক্তি। তিনি নিজেকে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে এ আবেদন করেছেন বলে জানিয়েছেন।
আবেদনে বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্বে থেকে ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে কমিশন দাবি এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারী তাঁর আবেদনে শহিদুল ইসলামের কর্মস্থল হিসেবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, ভাটারখাল, বরিশালের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ ছাড়া অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, মো. শহিদুল ইসলামের কথিত মদদে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ বণ্টন, সাবকন্ট্রাক্ট এবং ব্যবসায়িক সুবিধা দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। আবেদনে মেসার্স মোমিন সিকদার, মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ, ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং মেসার্স রাফিদ ট্রেডার্সের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজের ধরন, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করলে অনিয়মের বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগে প্রায় ৩২ কোটি টাকার কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্প এবং বরিশাল নগরীর কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণকাজের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী মনে করেন, এসব প্রকল্পের দরপত্র, কার্যাদেশ, বাস্তব নির্মাণকাজ, পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন ও নিরাপত্তা জামানতসংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করা হলে কথিত অনিয়মের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ, কাজের পরিমাণ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার জন্য তিনি দুদকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
আবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) প্রশ্নপত্র ফাঁসসংক্রান্ত আলোচিত ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতা ছিল। এ ছাড়া তাঁর নিয়োগ এবং তাঁর বন্ধুদের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, নিয়োগসংক্রান্ত কথিত অনিয়ম আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব গুরুতর অভিযোগের পক্ষে কী কী সুনির্দিষ্ট নথি বা প্রমাণ আবেদনকারীর কাছে রয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়েছে। আবেদনে দাবি করা হয়েছে, বরিশাল ও ঢাকায় জমি ক্রয়, ফ্ল্যাট ব্যবসা এবং রাজধানীর উত্তরায় ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জনের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এ ছাড়া গাড়ি ও অন্য সম্পদ বেনামে গড়ে তোলার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব সম্পদের বৈধ উৎস, মালিকানা, ক্রয়মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন যাচাই করা হলে সম্পদের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। তবে আবেদনে উত্থাপিত সম্পদের পরিমাণ ও মালিকানাসংক্রান্ত দাবিগুলো এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিলের বিপরীতে কমিশন আদায়, ঠিকাদারি কাজ বিক্রি, অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজের সংশোধন বা রিভাইজের নামে অতিরিক্ত বিল তৈরি এবং লাইসেন্সসংক্রান্ত কার্যক্রমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, প্রতিটি লাইসেন্সের বিপরীতে ১০ হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, প্রকল্পের নথিপত্র, বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া এবং আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেছেন, সরকারি চাকরির দায়িত্বে থেকে ব্যক্তিগতভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পরিচালনা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় কারসাজি এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকলে তা সরকারি চাকরির আচরণবিধি ও প্রযোজ্য আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। তাঁর মতে, অভিযোগগুলোর প্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে দুর্নীতি দমন কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
আবেদনে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর প্রাসঙ্গিক বিধান এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারার আলোকে অভিযোগগুলো পরীক্ষা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পে অর্থের ব্যবহার, ঠিকাদারি কার্যক্রম, কথিত কমিশন বাণিজ্য এবং সম্পদের উৎস সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে সাকিল আহম্মেদ বলেন, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে উঠে আসা অভিযোগ, তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করে তিনি দুদক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। তাঁর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করবে এবং তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এদিকে, অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. শহিদুল ইসলামের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে দুদক আবেদনটি গ্রহণ করেছে কি না, এ বিষয়ে কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা-ও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।