আনোয়ারাই মহাসড়কের ৭৭ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ অবৈধ দখলদারদের হাতে

কামরুল:

আনোয়ারায় চাতরী চৌমুহনী বাজার থেকে মেরিন একাডেমি পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের ৭৭ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ অবৈধ দখলদারদের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সড়কের দুই পাশ দখল করে শতাধিক অস্থায়ী দোকানপাট এবং সিএনজিচালিত ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড গড়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কে প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারী, যাত্রী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

চলতি বছরের শুরুতে চাতরী চৌমুহনী বাজার থেকে মেরিন একাডেমি পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। মেরিন একাডেমি, বন্দর সেন্টারসহ বিভিন্ন এলাকায় কাজ এগিয়ে চললেও চাতরী চৌমুহনী বাজার এলাকায় অবৈধ দখলের কারণে উন্নয়ন কাজে কাঙিক্ষত গতি আনা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগ। সড়ক উন্নয়ন কাজ নির্বিঘ্ন করতে গত এপ্রিলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগ চাতরী চৌমুহনী বাজারে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, উচ্ছেদের এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের ছত্রচ্ছায়ায় পুনরায় সড়কের দুই পাশ দখল করে শতাধিক অস্থায়ী দোকান গড়ে তোলা হয়। একই সঙ্গে সড়কের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে সিএনজিচালিত ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারের প্রায় ৩৪ ফুট প্রশস্ত সড়কের দুই পাশ ক্রমাগত দখল হতে হতে কোনো কোনো স্থানে যানবাহন ও পথচারী চলাচলের জন্য মাত্র ৭ থেকে ৮ ফুট জায়গা অবশিষ্ট রয়েছে। ফলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাজার এলাকায় যানজট লেগেই থাকে। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

সড়ক দখলের পাশাপাশি বাজারে দেখা দিয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মাণাধীন ড্রেনেও নিয়মিত ময়লা–আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। অনেক জায়গায় ড্রেনের ওপরও অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।

বৃষ্টির পানি জমে থাকা এসব ড্রেনে প্রতিদিন ময়লা–বর্জ্য ফেলায় পানি কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, জমে থাকা দূষিত পানি মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিতভাবে দোকান বসানো, সড়ক দখল এবং ড্রেনে ময়লা–আবর্জনা ফেলার কারণে বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অবৈধ দখলদারদের কারণে সড়ক উন্নয়ন কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বাজারের ব্যবসায়ী সাকিল বিন ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার জনভোগান্তি দূর করতে এবং এলাকার উন্নয়নে ৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে জাতীয় মহাসড়কের উন্নয়নকাজ করছে। এই উন্নয়নকাজ কি বাজারের অবৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য? অবৈধ দোকানদারদের কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা অসহায় হয়ে পড়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। নামমাত্র অভিযান হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার স্থাপনা গড়ে ওঠে। বর্তমানে বাজারের ড্রেনের পানি ময়লা–আবর্জনায় দূষিত হয়ে পড়েছে। এতে রোগবালাই ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে। আমরা দ্রুত বাজার ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করার দাবি জানাচ্ছি।

আনোয়ারা সচেতন নাগরিক ফোরামের সভাপতি আশরাফ চৌধুরী কুসুম বলেন, ‘বাজারের নামে স্থায়ী নিজস্ব জায়গা নেই। সিইউএফএল সার কারখানার জমির ওপর বাজারটি প্রতিষ্ঠিত হলেও নিজস্ব জায়গা না থাকায় সড়কের জায়গা দখল করে বাজার পরিচালিত হচ্ছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও জনভোগান্তির স্থায়ী সমাধানের জন্য আগামীতে এ বাজারের ইজারা বন্ধ করা প্রয়োজন।’

স্থানীয় সচেতন মহলেরও দাবি, শুধু সাময়িক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বাজারের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, যানজট নিরসন এবং সড়ক ও ড্রেন দখলমুক্ত রাখতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় বাজার ইজারা অব্যাহত থাকলে অবৈধ দখল ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

ব্যবসায়ী ইকবাল বলেন, ‘অবিলম্বে অভিযান চালিয়ে সড়ক দখলমুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ড্রেনের ময়লা–আবর্জনা পরিষ্কার এবং নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।’

দক্ষিণ চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিটু চাকমা বলেন, ‘অবৈধ দখলদারদের কারণে চাতরী চৌমুহনী এলাকায় আমাদের সড়ক উন্নয়ন কাজে গতি আনা যাচ্ছে না। উন্নয়ন কাজ পরিচালনার সময় অবৈধ সিন্ডিকেটের কাছে আমাদের লোকজন বারবার হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।’ তিনি বলেন, গত এপ্রিলে আমরা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করেছি। কিন্তু এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই উচ্ছেদ করা জায়গা আবার দখল হয়ে যায়।’

পিটু চাকমা আরও বলেন, সরকার এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সুবিধার জন্য এই মহাসড়ক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে, বাজারের অবৈধ দখলদারদের জন্য নয়। উন্নয়ন কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে আমরা সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করছি। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের দাবি, বারবার সাময়িক উচ্ছেদের পরিবর্তে প্রশাসন, সড়ক বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে সড়ক ও ড্রেন দখলমুক্ত রাখা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য অপসারণ এবং নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *