স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)-এ কর্মচারীদের একটি অংশের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানের এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিনকে ঘিরে ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, সিন্ডিকেট পরিচালনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে অযাচিত হস্তক্ষেপের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তৃতীয় শ্রেণির একজন কর্মচারী হয়েও আলাউদ্দিন বর্তমানে এমন প্রভাব বিস্তার করেছেন যে, তার অনুমতি ছাড়া প্রতিষ্ঠানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিআইডব্লিউটিসির প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইউনিটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। কেউ তার কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দেওয়া হয়, বদলির ভয় দেখানো হয় এবং কখনো কখনো সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়। ফলে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, পাবনার বাসিন্দা আলাউদ্দিন বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের নাম ব্যবহার করে বিআইডব্লিউটিসিতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। অভিযোগে বলা হয়, প্রশাসনের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সহযোগিতায় তিনি প্রতিষ্ঠানের বদলি, পদায়ন, টেন্ডার এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছেন।
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রশাসন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক জেসমিন আরা বেগম, চিফ অডিট অফিসার (চলতি দায়িত্ব) মো. রাশিদুর রহমান, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার সিপিএম মো. ফজলে রাব্বি এবং প্রশাসন পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) শেখ মুহা. নাসিম। অভিযোগকারীদের দাবি, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে। যদিও অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিআইডব্লিউটিসিতে যেকোনো বড় টেন্ডারের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে। ডক-২-এ কর্মরত লেবার আনোয়ারের মাধ্যমে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ক্রয়াদেশের মূল্যের পাঁচ শতাংশ অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরবরাহকারীরা কারণ জানতে চাইলে বলা হয়—এই অর্থ ‘দল পরিচালনা’ এবং ‘ম্যানেজমেন্টকে ম্যানেজ’ করার জন্য প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
বদলি বাণিজ্যের অভিযোগও অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগে বলা হয়েছে, সিপিএম মো. ফজলে রাব্বির সহযোগিতায় করপোরেশনের বিধিবিধান উপেক্ষা করে বিপুল অর্থের বিনিময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করা হচ্ছে। বিশেষ করে জাহাজি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলিকে কেন্দ্র করে কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর বদলির সুযোগ থাকলেও সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই বদলি দেওয়া হচ্ছে, আবার কেউ টাকা না দিলে দীর্ঘদিন একই স্থানে আটকে রাখা হচ্ছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বহর দপ্তরে কর্মরত কয়েকজন কর্মচারী অর্থের বিনিময়ে ইচ্ছেমতো জাহাজি পোস্টিংয়ের ব্যবস্থা করেন এবং সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত আলাউদ্দিনের কাছে পৌঁছায়। এমনকি আগামী ২০২৬ সাল পর্যন্ত বহু বদলি ও পদায়নের তালিকা আগেই চূড়ান্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বিআইডব্লিউটিসির ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর রাজনৈতিক চাপও প্রয়োগ করা হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলে অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও, আলাউদ্দিনের অনুসারীদের ডাকা কর্মসূচিতে উপস্থিত না হলে বিভিন্নভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়। যারা অংশ নেন না, তাদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালানো হয় এবং বদলির ভয় দেখানো হয়।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধান প্রকৌশলী মো. জিয়াউল ইসলামের কক্ষে ঢুকে তার সঙ্গে মারমুখী আচরণ করা হয়। নিয়মবহির্ভূতভাবে ফেরিতে মাস্টার পদায়ন না করায় জিএম (মেরিন) বাপ্পি কুমার অধিকারীর বিরুদ্ধে বহিরাগতদের এনে বিক্ষোভ ও স্লোগান দেওয়া হয়। এছাড়া প্রধান কার্যালয়ের ম্যানেজার মো. নাজমুলকেও ডেকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি হলো বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত সপ্তাহে আলাউদ্দিন, মো. ফজলে রাব্বি, আসাদ, আনোয়ার, শহিদুল ইসলাম খোকন, রীনা আক্তারসহ কয়েকজন কর্মচারী ও বহিরাগত চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে হুমকি দেন এবং মারমুখী আচরণ করেন। এ ঘটনার একটি অডিও রেকর্ডিং অভিযোগকারীদের কাছে রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, এতসব ঘটনার পরও প্রশাসন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং দায়িত্বশীল কিছু কর্মকর্তা নীরব ভূমিকা পালন করেছেন, যার কারণে অভিযুক্তদের দুঃসাহস আরও বেড়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিআইডব্লিউটিসি এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো প্রচার করা হচ্ছে, সেগুলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি তাকে হেয় করতে এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, বিআইডব্লিউটিসি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নিয়মিত নজরদারি রয়েছে। ফলে টেন্ডার বা বদলি নিয়ে যেসব অনিয়মের অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেগুলোর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। যদি সত্যিই এমন কিছু ঘটত, তাহলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অবশ্যই ব্যবস্থা নিত।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে তিনি মিটিংয়ে থাকার কথা জানিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন এবং খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে বুধবার (৮ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে শিমুল বিশ্বাস লিখেছেন, বিএনপির কোনো নেতাকর্মীর মাধ্যমে কেউ যদি হেনস্তা, নির্যাতন, দুর্নীতি বা চাঁদাবাজির শিকার হন, তাহলে তিনি যেন সরাসরি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে তিনি চাঁদাবাজ, প্রতারক ও দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
এদিকে বিআইডব্লিউটিসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনতে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তারা বলছেন, অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নিয়ে একটি স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।