মোঃআনজার শাহ
পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজের আলো দিয়ে অন্যের অন্ধকার দূর করেন। কুমিল্লার বরুড়াস্থ জনকল্যাণ সমিতির সদস্যরাও যেন সেই মানুষদেরই প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘদিন ধরে সমাজের অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়িয়ে আসা এই সংগঠন এবারও আয়োজন করল এক হৃদয়স্পর্শী চক্ষু চিকিৎসা শিবির। দিনব্যাপী এই আয়োজনে প্রায় এক হাজার মানুষের চোখের পরীক্ষা, বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ এবং ছানি ও নেত্রনালীর জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করে সংগঠনটি যেন হাজারো মানুষের জীবনে ফিরিয়ে দিল হারানো আলোর স্বপ্ন।
শুক্রবার (২৬ জুন) সকাল ৮টা থেকে বরুড়া উপজেলার ঝলম ইউনিয়নের মহিদপুর কলেজ মাঠ পরিণত হয় এক মানবিকতার মেলায়। অভিজ্ঞ চক্ষু বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে দূর-দূরান্ত থেকে আসা নারী, পুরুষ ও বয়োবৃদ্ধরা সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করেন তাঁদের দীর্ঘদিনের দুঃখ ঘোচানোর এক টুকরো আশায়। অনেকের চোখে তখন ছিল ক্লান্তি, কিন্তু চিকিৎসকের একটি আশ্বাসের বাণীতেই সেই ক্লান্তি বদলে যায় স্বস্তির হাসিতে।
আয়োজক সূত্রে জানা যায়, যেসব রোগীর ছানি কিংবা নেত্রনালীর সমস্যার কারণে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, তাঁদের কুমিল্লার আলেখারচর চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অপারেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি রোগীদের মাঝে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চশমা বিতরণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে কারও চোখের আলো অর্থের অভাবে নিভে না যায়।
বিনামূল্যে এই চিকিৎসাসেবা পেয়ে অনেক রোগীর চোখ ভিজে ওঠে কৃতজ্ঞতায়। তাঁরা বলেন, টাকার অভাবে বছরের পর বছর চিকিৎসার কথা ভাবতেও পারেননি। আজ যেন তাঁদের জীবনে নতুন এক ভোরের সূচনা হলো। আয়োজকদের প্রতি তাঁরা জানান আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও দোয়া।
বরুড়াস্থ জনকল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. শাহ আলম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “একটি চোখের আলোই একটি জীবনের আলো। যে মানুষটি অর্থের অভাবে নিজের চোখের আলো হারাতে বসেছিলেন, আজ তাঁর মুখে হাসি দেখে মনে হলো,এই পথচলা সার্থক। আমরা চাই, সমাজের কোনো মানুষ শুধু টাকার অভাবে অন্ধকারে ডুবে না যান। জনকল্যাণ সমিতি সবসময় মানুষের পাশে থাকবে, এই প্রতিশ্রুতি আমাদের অটুট।”
স্থানীয় সচেতন মহল এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও অনুকরণীয় বলে অভিহিত করেন। তাঁদের মতে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা মানবিক সমাজ গঠনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
দিনব্যাপী এই মানবিক আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বরুড়াস্থ জনকল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. শাহ আলম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুস সামাদ, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনির হোসেন, সাবেক সহ-সভাপতি আলহাজ মো. আমির হোসেন ভূঁইয়া, সাবেক সহ-সভাপতি মো. মিজানুর রহমান, নুরুদ্দিন খন্দকার স্বপন, মো. নুরুল আমিন, মো. কামাল হোসেন, মেহেদী হাসান শিশির, মো. কামাল হোসেন ভূঁইয়া, মেহেদী হাসান এবং ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম আজাদ। এছাড়াও স্থানীয় যুবসমাজ, এলাকার মুরব্বি ও অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করেন।
বরুড়ার মাটিতে আজ যা ঘটল, তা শুধু একটি চিকিৎসা শিবির নয়—এটি ছিল মানবতার এক জীবন্ত উৎসব। হাজারো মানুষের চোখে আলো ফিরিয়ে দিয়ে জনকল্যাণ সমিতি প্রমাণ করল, ভালোবাসা আর মানবিকতা দিয়েই গড়া যায় এক আলোকিত সমাজ।