সুমাইয়া আক্তার ;
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কড়া নির্দেশনা ও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বন্ড সুবিধার আড়ালে পিভিসি ফ্লেক্স আমদানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। প্রাপ্ত নথিপত্র ও অভিযোগ অনুযায়ী, বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত কাঁচামাল (Self-adhesive PVC/PVC Flex Banner) যথাযথভাবে ব্যবহার না করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগে এনবিআর থেকে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা বরাবর জমা পড়া এক সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র (ট্র্যাকিং নম্বর: ১৩০৮৯৪১০৯০০০০০৪) থেকে এই ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য উন্মোচিত হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ২০১৫ সালের মূল আদেশের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে জারি করা একটি স্পষ্ট নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট (ঢাকা দক্ষিণ)-এর যুগ্ম কমিশনার কামরুল ( বর্তমানে কাস্টমস রিস্ক ম্যানেজমেন্টে বদলিকৃত) এবং ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ব্যারিস্টার পূরবী এক অভিনব জালিয়াতির আশ্রয় নেন।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে এনবিআর থেকে জারি করা এক পত্রে জানানো হয় যে, ওয়্যারহাউস লাইসেন্সধারী কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত এসব পণ্য রপ্তানি না করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে, যা রাজস্বের জন্য বড় হুমকি । এই অপব্যবহার রোধে এনবিআর থেকে তথ্য তলব করা হলেও কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর কিছু অসাধু কর্মকর্তা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজ করছেন বলে এক লিখিত অভিযোগে জানা গেছে ।
অভিযোগ অনুযায়ী, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার কামরুল ইসলাম (যিনি বর্তমানে কাস্টমস রিস্ক ম্যানেজমেন্টে বদলিকৃত) এবং ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ব্যারিস্টার পূরবী (পূরবী সাহা) এনবিআরের আগের নির্দেশনা উপেক্ষা করে বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে মেসার্স ইউএজিএম বিডি লি: (UAGM BD Ltd) নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে বড় অংকের আমদানি প্রাপ্যতা সুবিধা প্রদান করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিদ্ধিরগঞ্জের এই প্রতিষ্ঠানটিকে গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ (নথিভুক্ত তারিখ অনুযায়ী) তারিখে ৩৯২১.৯০.৯৯ এইচএস কোডের আওতায় ৬৯০ মেট্রিক টন পিভিসি ফ্লেক্স আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা অন্যান্য সমজাতীয় বন্ড প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়নি । এই অনিয়মের নেপথ্যে কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেনের নাম উঠে এসেছে, যার খালাতো ভাই পরিচয়দানকারী মোজাম্মেল নামক এক ব্যক্তি এই সিন্ডিকেটের কন্ট্রাক্ট বা মধ্যস্থতার কাজ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে]। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বির্তকিত মোয়াজ্জেম হোসেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক-ভ্যাট প্রশাসনের সদস্য থাকাকালীন এনবিআরের কর্মকর্তাদের বদলি বা পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রেও মোজাম্মেলের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণ ও লিয়াজোর কাজটি করতেন। যেই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য জেসি কামরুল ইসলামও। যিনি সাংবাদিক নিযাতন সহ ঘুষ ও দুর্নীতির মতো নানান বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (দক্ষিণ) থেকে সম্প্রতি বদলি হন কাস্টমস রিস্ক ম্যানেজমেন্টে।
দুর্নীতিবাজ এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ নয়; মাঠ পর্যায়ে পণ্য ছাড়করণের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। মোয়াজ্জেম হোসেনের ঘনিষ্ঠ এবং ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রশাসন শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফ নিজে গেটে উপস্থিত থেকে মেসার্স ইউএজিএম বিডি লি:-এর পিভিসি ফ্লেক্সের চালান ছাড় করিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যার উদাহরণ গত ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে ‘সি ১০৯৯২৯৬’ নম্বর বিল অব এন্ট্রিটি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এআইআর (AIR) শাখা লক বা আটক করলেও, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের চাপে তা শেষ পর্যন্ত টিকবে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে । যদিও গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (কাস্টমস: রপ্তানি ও বন্ড) সুরাইয়া সুলতানা স্বাক্ষরিত পত্রে পিভিসি ফ্লেক্স আমদানির স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু যুগ্ম কমিশনার কামরুল ইসলাম ও উপ-কমিশনার ব্যারিস্টার পূরবী সাহার স্বাক্ষরিত আদেশে ইউএজিএম বিডি লি: বিশেষ সুবিধা পাওয়ায় বন্ড ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বন্ড সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে পূরবী সাহার এবং কামরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা সাংবাদিকদের সাথে কোন কথা বলবেন না বলে জানান। এই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী মহলের পক্ষে মো: ফারুক হোসাইন নামের এক ব্যক্তি এনবিআরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এই মেগা বন্ড কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত কর্মকর্তা ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা না নিলে রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি দেশীয় শিল্পখাতও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।