Deprecated: Function WP_Dependencies->add_data() was called with an argument that is deprecated since version 6.9.0! IE conditional comments are ignored by all supported browsers. in /home/u102988081/domains/dailyswadhinsangbad.com/public_html/wp-includes/functions.php on line 6260
ঐতিহাসিক বড় সরদারবাড়িতে কোক স্টুডিওর শুটিং, ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ - দৈনিক স্বাধীন সংবাদ

ঐতিহাসিক বড় সরদারবাড়িতে কোক স্টুডিওর শুটিং, ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ

জেলা প্রতিনিধি, নারায়ণগঞ্জ:

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ঐতিহাসিক বড় সরদারবাড়ি বাণিজ্যিক শুটিংয়ের জন্য ভাড়া দেওয়ার পর স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির অভিযোগ, সম্প্রতি কোক স্টুডিও বাংলা সিজন-৪-এর ভিডিও ধারণ এবং কোকা-কোলার বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণের জন্য চার দিন ঐতিহাসিক বড় সরদারবাড়ি ব্যবহার করা হয়। এ সময় ভারী ক্যামেরা, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর, আলোকসজ্জা ও সাউন্ড সিস্টেমসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে ভবনের কার্নিশ, দেয়াল, অলংকরণ ও নকশার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গতকাল শনিবার (২৯ আগস্ট) নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরে বড় সরদারবাড়ির দ্রুত সংস্কার, শুটিংয়ের অনুমোদন ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য প্রকাশ এবং অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়। সংগঠনের আহ্বায়ক কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

শাহেদ কায়েস বলেন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের উদ্যোগে ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণে দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকা বড় সরদারবাড়ির সংস্কারকাজ শুরু হয় ২০১২ সালে এবং শেষ হয় ২০১৭ সালে। পরের বছর এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

তিনি বলেন, শত শত বছরের পুরোনো এই স্থাপনা সাধারণ কোনো শুটিং লোকেশন নয়। এর চুন-সুরকি, ইট, কাঠ, প্লাস্টার, মেঝে ও স্থাপত্যিক অলংকরণ অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে শুটিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

শাহেদ কায়েস প্রশ্ন তোলেন, শুটিংয়ের আগে স্থাপনাটির ওপর কোনো হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছিল কি না এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় মতামত বা অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না।

সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, শুটিংয়ের জন্য আনা সরঞ্জাম ও অস্থায়ী স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার সময় ভবনের দ্বিতীয় আঙিনার কাছে একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া কার্নিশসহ ভবনের বিভিন্ন অংশে দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।

সংগঠনটির দাবি, বড় সরদারবাড়ির রেস্টোরেশন প্রকল্পের পরিচালক স্থপতি অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ শুটিংয়ের আগে ভবনটি পরিদর্শন করেছিলেন। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারে স্থাপত্যিক অলংকরণের ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় তিনি ভবনটি শুটিংয়ের জন্য ভাড়া না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। তবে সেই পরামর্শ উপেক্ষা করে ভবনটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শাহেদ কায়েস।

শুটিংয়ের অনুমোদন, ভাড়া বাবদ আদায় করা অর্থ এবং শুটিংয়ের আগে ও পরে ভবনের অবস্থার নথি জনসম্মুখে প্রকাশের দাবিও জানানো হয়।

শাহেদ কায়েসের অভিযোগ, একটি বহুজাতিক কোম্পানির বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণের জন্য চার দিনের জন্য বড় সরদারবাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। কাগজপত্রে ভাড়া বাবদ ৬ লাখ টাকা আদায়ের কথা উল্লেখ থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

ফাউন্ডেশনের কর্মকাণ্ড নিয়েও অভিযোগ

বড় সরদারবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের আর্থিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়েও একাধিক অভিযোগ তোলা হয় সংবাদ সম্মেলনে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে কারুপল্লির দোকান বরাদ্দে অনিয়ম, প্রকৃত কারুশিল্পীদের বঞ্চিত করা, বড় সরদারবাড়ি মেরামতের নামে ভুয়া বিল তৈরি, অনুমোদন ছাড়া অর্থ ব্যয়, আবাসিক এলাকায় কোরবানি শেড নির্মাণ এবং এটিএম বুথের শেড নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো।

সংগঠনটির দাবি, দুটি এটিএম বুথ নির্মাণে প্রকৃত ব্যয় প্রায় ৬ লাখ টাকা হলেও বিল-ভাউচারে প্রায় ৩০ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ উদযাপনের অনুষ্ঠানে টেন্ডার ছাড়াই এফ ফাইভ কমিউনিকেশন নামের একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানকে প্রায় অর্ধকোটি টাকার কাজ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। ওই প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া বিল ও চেক তৈরি করে প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।

ফাউন্ডেশনের স্মারকগ্রন্থ প্রকাশে প্রকৃত আনুমানিক ব্যয় ৫ লাখ টাকা হলেও প্রায় ১২ লাখ টাকার বিল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।

এ ছাড়া শ্রমিকদের নামে ভুয়া বিল তৈরি, পরিচালনা বোর্ডের নির্দেশনা অমান্য করে বেসরকারি ব্যাংকে অর্থ রাখা, সুবর্ণজয়ন্তী স্মারকগ্রন্থ প্রকাশে অতিরিক্ত বিল এবং কারুপল্লির কারুশিল্পীদের কাঁচামাল কেনার নামে ভুয়া বিল তৈরির অভিযোগও তোলা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম, সহকারী পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন, গাইড লেকচারার আশরাফুল আলম নয়ন এবং প্রকৌশলী হানিফ আহমেদের বিরুদ্ধে এসব অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়।

ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষার দাবি

সংবাদ সম্মেলনে চিত্রশিল্পী ও লেখক রফিউর রাব্বি বলেন, সোনারগাঁ একসময় প্রায় ৩০০ বছর বাংলার রাজধানী ছিল। ফলে এখানকার প্রত্নসম্পদ ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, বড় সরদারবাড়ির মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা কীভাবে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের শুটিংয়ের জন্য ভাড়া দেওয়া হলো এবং এ ক্ষেত্রে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা কী ছিল।

শাহেদ কায়েস বলেন, তাদের উদ্যোগ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; বরং ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রকৃত কারুশিল্পী এবং জনগণের সম্পদ রক্ষার জন্য। বড় সরদারবাড়ির ক্ষতি হলে সেটি পুনর্নির্মাণ করে শত শত বছরের ইতিহাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিচারবিভাগীয় বা সমপর্যায়ের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা পুনরুদ্ধারের দাবি জানানো হয়।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক কবি রহমান মুজিব, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সহসভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল এবং সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতনের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক কবি মোয়াজ্জেমুল হক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *