কক্সবাজার জেলা পরিষদের গোডাউন থেকে রাতের আঁধারে ৫ লাখ টাকার ত্রাণসামগ্রী সরানোর অভিযোগ

নাছির উদ্দীন:

কক্সবাজার জেলা পরিষদের গোডাউন থেকে রাতের আঁধারে ট্রাকযোগে প্রায় ৫ লাখ টাকা মূল্যের ঢেউটিন, কম্বলসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জেলা পরিষদের উচ্চমান সহকারী বখতিয়ার উদ্দিনের বিরুদ্ধে। গত ২৪ অক্টোবর রাত আনুমানিক ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সংগ্রহ করা ভিডিও ফুটেজও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তবে সরকারি গোডাউন থেকে এসব মালামাল কোথায়, কী উদ্দেশ্যে এবং কার নির্দেশে নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অভিযোগের বিষয়টি ঘিরে জেলা পরিষদের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সরকারি সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকারি ত্রাণসামগ্রী সাধারণত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের সহায়তায় ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। সেই মালামাল যদি যথাযথ অনুমোদন ও নথিপত্র ছাড়া গোডাউন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা সরকারি সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। তবে মালামাল সরানোর প্রকৃত কারণ এবং এ ঘটনায় কারও দায় রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগ রয়েছে, বখতিয়ার উদ্দিন একই দপ্তরে প্রায় ২৮ বছর ধরে কর্মরত রয়েছেন। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সুযোগে তিনি দপ্তরের বিভিন্ন কাজে প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগকারীদের দাবি। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের কর্মস্থলকেন্দ্রিক প্রভাবের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ যথাযথভাবে যাচাই ও নিষ্পত্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

শুধু গোডাউন থেকে ত্রাণসামগ্রী সরানোর অভিযোগই নয়, জেলা পরিষদের সচিবের জন্য নির্ধারিত সরকারি বাসা দখল করে সপরিবারে বসবাস করার অভিযোগও রয়েছে বখতিয়ার উদ্দিনের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই বাসায় বসবাস করায় জেলা পরিষদে নতুন সচিব যোগদান করলেও নির্ধারিত সরকারি বাসায় উঠতে পারছেন না। এতে সরকারি আবাসন ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে তাঁরা মনে করছেন। সরকারি বাসাটি বরাদ্দের নিয়ম, বর্তমান দখলদারত্বের বৈধতা এবং এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অবস্থান যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া জেলা পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়নকাজের ঠিকাদারদের ফাইল প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে প্রতি ফাইলে ৩ শতাংশ হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে বখতিয়ার উদ্দিনের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, কাজের ফাইলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে এ ধরনের অর্থ লেনদেনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা নির্দিষ্ট ঠিকাদারের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, ফাইলের নথিপত্র এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করা জরুরি।

অন্যদিকে, গত ২৪ অক্টোবর রাতে জেলা পরিষদের গোডাউন থেকে ঢেউটিন, কম্বলসহ ত্রাণসামগ্রী ট্রাকযোগে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বখতিয়ার উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগটি সঠিক নয়। ফলে গোডাউন থেকে মালামাল সরানোর ঘটনা, এর অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সূত্রের দাবি, জেলা পরিষদের গোডাউনের চাবি বখতিয়ার উদ্দিনের কাছে থাকে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে রাতের আঁধারে মালামাল সরানোর ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে গোডাউনের চাবি কার কাছে থাকে, মালামাল বের করার অনুমতি কে দিয়েছেন এবং ট্রাকটি কার নির্দেশে সেখানে প্রবেশ করেছিল—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট নথি ও ভিডিও ফুটেজ যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এ ঘটনায় জেলা পরিষদের গোডাউনের মজুত রেজিস্টার, মালামাল বিতরণ ও হস্তান্তরের নথি, সংশ্লিষ্ট চালান, ট্রাক চলাচলের তথ্য এবং সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে গোডাউন থেকে কোনো মালামাল বের করা হয়ে থাকলে তার অনুমোদন, গন্তব্য এবং প্রাপকের পরিচয়ও যাচাই করা প্রয়োজন। এসব তথ্য পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক এটিএম নুরুল বশর চৌধুরীর কাছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। তাঁদের দাবি, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত কর্মচারী বখতিয়ার উদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সরকারি সম্পদ ও ত্রাণসামগ্রীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সরকারি আবাসন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশা সচেতন নাগরিকদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *