মোঃ রাসেল:
মাঠপর্যায়ে বিন্দুমাত্র কাজ না করেই সরকারি প্রকল্পের পুরো টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাতের এক নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে বান্দরবানের লামা উপজেলার ৭নং ফাইতং ইউনিয়নে। শুধু তাই নয়, এই মহাদুর্নীতি ধামাচাপা দিতে পবিত্র ‘নয়াপাড়া বাইতুন নূর জামে মসজিদ’-এর দেওয়ালে প্রকল্পের সরকারি সাইনবোর্ড টাঙানোর পর তা একদিনের মাথায় গায়েব করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই নাটকীয় জালিয়াতিতে এলাকায় চরম উত্তেজনা ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অর্থায়নে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টি.আর.-২য় পর্যায়) কর্মসূচির আওতায় ফাইতং ইউনিয়নের নয়াপাড়া এলাকার হাসানের দোকানের পাশে একটি গণশৌচাগার নির্মাণের জন্য ১,২০,০০০/- (এক লাখ বিশ হাজার) টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পটির সভাপতি ফাইতং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পস্থানে কোনো ধরনের ইটের গাঁথুনি বা শৌচাগারের অস্তিত্ব তো দূরের কথা, সীমানাও নির্ধারণ করা হয়নি। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বরাদ্দের সম্পূর্ণ বিল তুলে পকেটে ভরেছে চক্রটি।
জালিয়াতি প্রকাশ পাওয়ার ভয়ে অতি সম্প্রতি চক্রটি স্থানীয় নয়াপাড়া বাইতুন নূর জামে মসজিদের দেওয়ালে এই গণশৌচাগার প্রকল্পের সাইনবোর্ডটি এনে ঝুলিয়ে দেয়। তবে মসজিদের দেওয়ালে শৌচাগারের সাইনবোর্ড দেখে মুসল্লি ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে এবং বিষয়টি গণমাধ্যমকর্মীদের নজরে আসার আশঙ্কায় মাত্র একদিন পরেই রাতের আঁধারে সাইনবোর্ডটি সেখান থেকে উধাও করে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীরা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “সরকারি বরাদ্দের কথা শুনে আমরা ভেবেছিলাম সাধারণ মানুষের উপকার হবে। কিন্তু কাজের নামগন্ধ না করে সব টাকা হরিলুট করা হয়েছে। চুরির ঢাকনা দিতে পবিত্র মসজিদের দেওয়ালে শৌচাগারের বোর্ড লাগানো এবং পরদিনই তা সরিয়ে ফেলা ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত। আমরা এই দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান ও কর্মকর্তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার চাই।”
এদিকে এই পুকুরচুরির ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে লামা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. ময়নুল ইসলাম (শিমুল)-এর ভূমিকা নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে এই উপজেলায় কর্মরত থাকার পরও কীভাবে মাঠপর্যায়ে কোনো প্রকার তদারকি বা বাস্তব পরিদর্শন ছাড়াই এমন একটি ভুয়া প্রকল্পের চূড়ান্ত বিল পাস হলো, তা নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ ও সন্দেহের দানা বেঁধেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প কর্মকর্তার চরম অবহেলা এবং পরোক্ষ যোগসাজশ ছাড়া এভাবে কাজ না করেই ‘ভুয়া মাস্টাররোল’ ও ফাইল তৈরি করে বিল তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন নিশ্চিত করা তাঁর আইনগত কর্তব্য ছিল, যা তিনি পুরোপুরি লঙ্ঘন করেছেন।
দুর্নীতির বিষয়ে জানতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন ও দায়সারা বক্তব্য দিয়ে বলেন, “আমরা এই বিষয়ে এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। যদি লিখিত অভিযোগ পাই, তবে তদন্ত সাপেক্ষে প্রকল্প সভাপতির (ইউপি চেয়ারম্যান) কাছ থেকে বরাদ্দের ওই টাকা ফেরত নেওয়া হবে।” প্রকল্প কর্মকর্তার এমন মন্তব্য যেন চোরকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার শামিল বলে মনে করছেন সচেতন মহল। যেখানে কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়া স্পষ্ট অপরাধ, সেখানে লিখিত অভিযোগের অজুহাত দেখিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা পিআইওর রহস্যজনক ভূমিকাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
অন্যদিকে, ঘটনার পর থেকে মূল অভিযুক্ত ফাইতং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক গা-ঢাকা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য নেওয়ার জন্য ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, যা তাঁর প্রতি স্থানীয়দের সন্দেহ ও ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পবিত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের এই ন্যক্কারজনক জালিয়াতি এবং প্রকল্প কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে বান্দরবান জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।