মোঃ আনজার শাহ:
কুমিল্লাকে পৃথক বিভাগ ঘোষণার দীর্ঘদিনের দাবি নতুন মোড় নিয়েছে ২০২৬ সালের ১৬ মে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর বাজার মাঠে অনুষ্ঠিত এক পথসভায়। এই পথসভায় উপস্থিত থেকে বিভাগের নামকরণ ও বাস্তবায়ন নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও গৃহায়ণ-গণপূর্তমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণায় আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে দেশবাসী, বিশেষত কুমিল্লার মানুষ। তবে একই সময়ে ভিন্ন এক ঘটনায়, কুমিল্লা বিভাগ প্রসঙ্গে মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার মুখে পড়েছেন লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি, যাঁর বক্তব্যে ব্যথিত হয়েছেন কুমিল্লাবাসী।
“জনগণের দাবি হলে বাস্তবায়ন হবে” তারেক রহমান:
লক্ষ্মীপুর বাজার মাঠের পথসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, “কুমিল্লা নামে বিভাগ হওয়াটা যদি এই অঞ্চলের জনগণের দাবি হয়ে থাকে, ইনশাআল্লাহ সেটির বাস্তবায়ন হবে।”
উপস্থিত জনতা যখন “কুমিল্লা বিভাগ চাই” স্লোগান তোলেন, তখন তিনি বলেন, সবার সহমত থাকলে এবং এটি জনগণের প্রকৃত দাবি হলে সরকার অবশ্যই তা পর্যায়ক্রমে পূরণ করবে। নির্বাচনের আগে দল যে পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিল, সরকার গঠনের পর জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি কুমিল্লা অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এই আশ্বাসবাণী শোনার পর মাঠজুড়ে হর্ষধ্বনি দিয়ে ওঠেন উপস্থিত হাজারো মানুষ। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটার সম্ভাবনায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন কুমিল্লাসহ সারা দেশের মানুষ।
“তিতাস নয়, কুমিল্লা নামেই বিভাগ চাই” জাকারিয়া তাহের
একই পথসভায় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, সাবেক সরকারের আমলে কুমিল্লাকে বিভাগ করার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুমিল্লার নামে বিভাগ ঘোষণা করেননি, বরং ‘তিতাস’ নামে বিভাগ ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, কুমিল্লার মানুষ সেই নাম ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল, যার কারণে আজ পর্যন্ত কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা কুমিল্লা নামেই কুমিল্লা বিভাগ চাই।”
মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের কুমিল্লার ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেন, প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই শহর থেকে বহু গুণী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব উঠে এসেছেন, তবে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কুমিল্লার প্রাপ্য উন্নয়ন হয়নি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সুযোগ পেলে কুমিল্লা শহরকে একটি আধুনিক ও সুন্দর শহরে রূপান্তরের পাশাপাশি কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন করা হবে।
সভায় তিনি একটি সুখবরও দেন,ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজারগামী রেললাইনের সঙ্গে কুমিল্লা থেকেও সরাসরি রেল সংযোগের বিষয়ে কাজ করছেন বলে জানান তিনি। এ ছাড়া কুমিল্লা কৃষিনির্ভর একটি অঞ্চল হওয়ায় এখানে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তিনি জানান, কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, বর্তমান নেতৃত্বের মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত হতে দেখতে চান তাঁরা।
নাম নিয়ে মন্তব্যে বিতর্কে এমপি অ্যানি, ব্যথিত কুমিল্লাবাসী
অন্যদিকে কুমিল্লা বিভাগ প্রসঙ্গে ভিন্ন একটি মন্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার মুখে পড়েছেন লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি। সম্প্রতি কুমিল্লাকে বিভাগ ঘোষণার প্রসঙ্গে তাঁর একটি বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর কুমিল্লার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে অ্যানিকে কুমিল্লার আগে নোয়াখালীকে বিভাগ ঘোষণার দাবি জানাতে দেখা যায়। এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের দীর্ঘদিনের দাবির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে এবং কুমিল্লার মানুষের মনে জন্ম দিয়েছে গভীর ক্ষোভ ও বেদনার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট, মন্তব্য ও ভিডিওতে অনেকেই তাঁর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করছেন।
কুমিল্লার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বলছেন, কুমিল্লাকে বিভাগ করার দাবি দীর্ঘদিনের। বৃহত্তর কুমিল্লার প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এ দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। অনেকে মত দিয়েছেন, কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে কোনো বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও দীর্ঘদিনের জনদাবি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তবে অন্যদিকে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর কিছু মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোয়াখালীকে বিভাগ ঘোষণার দাবির পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, নোয়াখালী অঞ্চলের প্রশাসনিক গুরুত্ব ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতা বিবেচনায় নোয়াখালীকেও বিভাগ ঘোষণার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
অ্যানির বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত তাঁর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা কিংবা বক্তব্য প্রত্যাহার বা পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে কুমিল্লা বিভাগ ইস্যুতে তাঁর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় সংশ্লিষ্টরা:
কুমিল্লাকে দ্রুত বিভাগে রূপান্তরের দাবি সম্প্রতি বিভিন্ন মহল থেকে জোরালোভাবে সামনে এসেছে। এই দাবিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিনের কুমিল্লা বিভাগ দাবির বিষয়ে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং নোয়াখালীসহ বৃহত্তর অঞ্চলের বিভাগসংক্রান্ত দাবিগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কোন প্রশাসনিক কাঠামোয় রূপ নেয়, সেদিকেই নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। একদিকে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে আনন্দিত জনতা, অন্যদিকে একটি বিতর্কিত মন্তব্যে সৃষ্ট ক্ষোভ এই দুই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই কুমিল্লা বিভাগ ইস্যু এখন দেশজুড়ে আলোচনার শীর্ষে।