কেরানীহাটে সওজ ও প্রশাসনের যৌথ উচ্ছেদ অভিযান: মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে গেল শত শত দোকান, অঝোরে কাঁদলেন ব্যবসায়ীরা

আব্দুল আজিজ আল মাক্কী ::

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র সাতকানিয়ার কেরানীহাটে অবৈধ দখলমুক্ত করতে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন ও সড়ক এবং জনপথ (সওজ) বিভাগ।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত এ অভিযান পরিচালিত হয়। বুলডোজারের সশব্দ গর্জনে নিমেষেই গুঁড়িয়ে যায় মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠা শত শত অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট। কর্তৃপক্ষের মতে, যানজট নিরসন ও সড়ক নিরাপদ করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এর পেছনে চাপা পড়েছে শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ঘাম আর উপার্জনের শেষ সম্বল।
ফুটপাতে কান্নার রোল, সম্বল রক্ষার আকুল চেষ্টা
অভিযান চলাকালে কেরানীহাটে নেমে আসে বেদনাবিধুর দৃশ্যপট। ভারী যন্ত্রপাতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে সওজের দল কাজ শুরু করলে অনেক ব্যবসায়ী তাঁদের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পর্যন্ত পাননি। উচ্ছেদের আগের দিন কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের প্রথম এক কিলোমিটার এলাকায় মাইকিং করা হলেও, সকালে অভিযান শুরু হতেই সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে শুরু হয় হুড়োহুড়ি ও মালামাল সরানোর আকুল চেষ্টা।
বছরের পর বছর কষ্টার্জিত সঞ্চয় দিয়ে গড়ে তোলা দোকানপাট ভাঙতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন ক্ষুদ্র দোকানদারেরা। অনেকে ধসে পড়া টিন ও ভাঙা আসবাবের স্তূপ থেকে অবশিষ্ট মালামাল উদ্ধারে মরিয়া হয়ে ওঠেন।
ক্ষোভ ও আর্তনাদ প্রকাশ করে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ফারুখ আজম বলেন, “এনজিও আর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এই দোকানটা দাঁড় করিয়েছিলাম। পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল ছিল এটাই। চোখের সামনে কয়েক মিনিটে আমার জীবনের সব উপার্জন ধুলোয় মিশে গেল।” তাঁর মতো আরও অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিওর ঋণে জর্জরিত বলে জানান তিনি।

অভিযান চলাকালে সওজ দোহাজারী বিভাগের পক্ষ থেকে কেরানীহাটের উত্তর ও দক্ষিণ অংশ এবং সওজ বান্দরবান বিভাগের পক্ষ থেকে কেরানীহাট-বান্দরবান জেলা সড়ক হয়ে ২ নম্বর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।
অভিযানের স্থানটি পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, মধুবন সংলগ্ন টিনশেডের পুরোনো একটি যাত্রী ছাউনি রক্ষা করার চেষ্টা করা হলেও স্থানীয় কিছু মানুষের প্রভাবে সেটিও ভেঙে ফেলা হয়। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম-বান্দরবানগামী অসংখ্য যাত্রী এ ছাউনিটিতে নিরাপদে অবস্থান নিতেন বলে জানান স্থানীয়রা।

অভিযানে দায়িত্বরত বান্দরবান সড়ক বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোস্তফা মুন্সী বলেন, “কেরানীহাট থেকে ২ নম্বর ব্রিজ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালিয়ে অন্তত দুই শতাধিক অস্থায়ী দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে।” ব্যবসায়ীদের কোনো পূর্ব নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করেন, “দোকান বসানোর সময় তো আমাদের কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি, আমরা কীভাবে নোটিশ দেব? তবে বুধবার এলাকায় মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছিল।”
অন্যদিকে, দোহাজারী সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলীর পক্ষ থেকে হোয়াটসঅ্যাপ কলে জানান, “কতটি দোকান উচ্ছেদ হয়েছে তার নির্দিষ্ট হিসাব এই মুহূর্তে জানা নেই। তবে গতকাল এলাকায় মাইকিং করা হয়েছিল। বিষয় সম্পর্কে স্থানীয় সংসদ সদস্যও অবগত রয়েছেন।”
উচ্ছেদ অভিযানকালে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজীব দাশ পুরকায়স্থ, সহকারী কমিশনার (ভূমি), সাতকানিয়া থানা পুলিশের একটি টিম এবং বিপুল সংখ্যক স্থানীয় উৎসুক জনতা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও আশঙ্কার সুর
এদিকে উচ্ছেদ অভিযান শেষ হতে না হতেই দেখা গেছে নতুন বিতর্ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়ক ও ফুটপাত খালি করার পরপরই কেরানীহাট-বান্দরবান সড়ক পুনরায় সিএনজি অটোরিকশা ও লোকাল বাসের ডাবল পার্কিংয়ের দখলে চলে গেছে।
স্থানীয় সচেতন মহল সওজের এ পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানালেও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করে ফুটপাত উন্মুক্ত করা হলেও দু’দিন পর যদি অন্য কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী এসে পুনরায় ‘দোকান বাণিজ্য’ শুরু করে, তবে তা পূর্বের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর চরম অন্যায় হবে। কেরানীহাটে একদল স্বার্থান্বেষী মহল আবার নতুন করে সড়ক দখলের উদ্দেশ্যে ওঁৎ পেতে আছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *