খসরু মৃধা:
গাজীপুরের জয়দেবপুরে ডোবার পানিতে ব্রিফকেস ও প্লাস্টিকের বস্তা থেকে উদ্ধার হওয়া খণ্ডিত ও অর্ধগলিত নারীর লাশের পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত দা-বঁটি, নিহতের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) কার্ড, মোবাইল ফোন ও জুতা উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল সোমবার পিবিআই থেকে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানানো হয়।
গ্রেপ্তার তিনজন হলেন—মো. মিজানুর রহমান মিল্টন (২৪), মো. মিশন ইসলাম (২২) ও তার মা বানু আক্তার (৪৩)। তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পিবিআই জানায়, নিহত নারীর নাম ডলি আক্তার (৩০)। তিনি জয়দেবপুর থানাধীন বানিয়ারচালা মেম্বারবাড়ি এলাকায় ভাড়া বাসায় একা থাকতেন। স্বামীর সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল।
গত শুক্রবার ভবানীপুর এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে একটি খালের পানিতে ব্রিফকেস ও প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা নারীর খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশের পরিচয় অজ্ঞাত থাকায় পিবিআই গাজীপুর জেলা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ছায়াতদন্ত শুরু করে।
পিবিআইয়ের তদন্তে জানা যায়, ডলি আক্তারের সঙ্গে মিশন ইসলামের প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তারা একই গার্মেন্টসে চাকরি করার সুবাদে পরিচিত হন। ডলি প্রায়ই মিশনের ভাড়া বাসায় যাতায়াত করতেন।
তদন্ত ও আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ডলি মিশনের বাসায় যান। সেখানে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও ডলি একসঙ্গে খাবার খান। পরে বানু পাশের কক্ষে ঘুমাতে গেলে মিশন ও ডলি একই কক্ষে ছিলেন।
পিবিআইয়ের দাবি, বিয়ে ও আগের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধের জেরে মিশনের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়। একপর্যায়ে ডলিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। রাতে ডলিকে ঘুমের ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ানোর পর আনুমানিক রাত ২টার দিকে লুঙ্গি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে এবং পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
হত্যার পর লাশ চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। পরদিন সকালে বানু আক্তার ঘর পরিষ্কার করার সময় লাশ দেখতে পান। পরে লাশ গুম করতে মিশন একটি স্যুটকেস কিনে আনেন। লাশ স্যুটকেসে ঢোকাতে না পারায় ব্লেড ও দা-বঁটি দিয়ে লাশটি কোমর থেকে দুই টুকরা করা হয়। একাংশ স্যুটকেসে এবং অন্য অংশ পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা হয়।
এরপর মিশন তার বন্ধু মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে ডেকে আনেন। মিল্টন স্যুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলতে সহযোগিতা করেন। পরে মিশন, তার মা বানু ও মিল্টন সেগুলো রাজেন্দ্রপুর হয়ে ভবানীপুর এলাকায় নিয়ে যান। সেখান থেকে মিশন ও মিল্টন স্যুটকেস ও বস্তাটি ব্রিজের নিচের খালের পানিতে ফেলে দেন।
পিবিআই জানায়, এ সময় মিল্টনের হাতে রক্ত লাগলে তিনি স্যুটকেস ও বস্তার ভেতরে কী রয়েছে জানতে চান। তখন মিশন তাকে জানান, সেখানে তার প্রেমিকা ডলি আক্তারের লাশ রয়েছে।
এ ঘটনায় ডলির বড় ভাই সোহেল বাদী হয়ে ১২ সেপ্টেম্বর জয়দেবপুর থানায় হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগে মামলা করেন। পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তারের তত্ত্বাবধানে মামলাটির তদন্ত করছেন পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আনসারী।
পরে ১২ সেপ্টেম্বর সদর মেট্রো থানাধীন বাহাদুরপুর তুলসীভিটা এলাকার পৃথক ভাড়া বাসা থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর মিশনের ভাড়া বাসা থেকে একটি দা-বঁটি, স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ, ডলির এনআইডি কার্ড, বাটন মোবাইল ফোন ও এক জোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া স্যুটকেস কেনার বিষয়ে তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পিবিআই।
পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেপ্তার তিন আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তারা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।