নিজস্ব প্রতিবেদক:
সংসদের ভেতরে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও আচরণ সম্পর্কে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে বিভিন্ন নির্দেশনা থাকলেও সংসদের বাইরে জনপ্রতিনিধিদের নৈতিক আচরণ, স্বার্থের সংঘাত ও দায়দায়িত্ব নিয়ে পৃথক কোনো আইন বা পূর্ণাঙ্গ আচরণবিধি নেই। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াতে ইসলামী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। পরে তিনি জানান, ভিডিওতে থাকা নারী মরিয়ম খাতুন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। গত ২০ সেপ্টেম্বর সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গাজী নজরুলকে আসামি করা হয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনপ্রতিনিধিদের জন্য বিশেষায়িত ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী বলা যায় না। তবে গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন ও সংসদের মর্যাদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু সংসদের বাইরে তাঁদের নৈতিক আচরণ, স্বার্থের সংঘাত ও দায়িত্ব সম্পর্কে পৃথক আইন বা আচরণবিধি না থাকায় এসব বিষয়ে জবাবদিহির কাঠামো স্পষ্ট নয়।
ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, ভুটান ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণবিধি রয়েছে।
সংসদ সদস্যদের আচরণ নিয়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ অতীতেও নেওয়া হয়েছিল। ২০০৩ সালে তৎকালীন বিএনপির সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান ‘দ্য মেম্বার অব পার্লামেন্ট (কোড অব কনডাক্ট) বিল-২০০৩’ নামে একটি বেসরকারি বিলের নোটিশ দিয়েছিলেন। বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানো হলেও পরবর্তী সময়ে এর আর অগ্রগতি হয়নি।
এরপর ২০১০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী ‘সংসদ সদস্য আচরণ বিল’ নবম সংসদে উত্থাপন করেন। ২০১১ সালের মার্চে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি বিলটি পাসের সুপারিশ করলেও নবম সংসদের মেয়াদে সেটি আইনে পরিণত হয়নি।
প্রস্তাবিত এসব উদ্যোগে সংসদ সদস্যদের নৈতিক অবস্থান, দায়িত্ব, স্বার্থের সংঘাত, আর্থিক তথ্য প্রকাশ এবং সংসদীয় ‘নৈতিকতা কমিটি’ গঠনের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা ছিল।
সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন পর্যায়ে এসেছে। ২০১২ সালে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলে সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি প্রণয়নের লক্ষ্য উল্লেখ করা হলেও তা বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
পরবর্তী সময়ে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও সংসদ সদস্যদের আচরণ নিয়ে আইন করার সুপারিশ করে। জুলাই জাতীয় সনদেও সংসদীয় কমিটি ও সদস্যদের বিশেষ অধিকার, অধিকারের সীমা এবং দায় নির্ধারণে আইন প্রণয়নের বিষয়ে প্রস্তাব রয়েছে।
গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর টিআইবি আবারও জনপ্রতিনিধিদের জন্য বিশেষায়িত, পূর্ণাঙ্গ ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে। সংস্থাটি একটি ‘এথিক্স কমিটি’ গঠনের কথাও বলেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে গুরুতর নৈতিক স্খলন, স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার বা সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্নকারী আচরণের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্যপদ বাতিল বা আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্ন উঠবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট বিধান থাকা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি।
সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদও সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণবিধির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণ আইন বা ‘কোড অব কনডাক্ট’ রয়েছে; বাংলাদেশেও এ ধরনের আচরণবিধি প্রয়োজন।
তবে গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে চলমান মামলার অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। এ অবস্থায় সংসদ সদস্যদের নৈতিক আচরণ, জবাবদিহি ও সংসদের মর্যাদা রক্ষায় পৃথক আচরণবিধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।