অনলাইন ডেস্ক:
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষিখাত। প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ আরও সহজলভ্য করার পাশাপাশি মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা হচ্ছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানি শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে যোগ দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, একটি শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়ে তুলতে পারে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ।’
উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুদৃঢ় করা হচ্ছে। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখতে হবে। আইনের শাসন প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সমর্থন ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংকটের মূল কারণগুলোর সমাধান করতে হবে।
বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দেশকে শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করা হচ্ছে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের অগ্রাধিকার দিয়ে এসব কর্মসূচি সাজানো হয়েছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি ‘কৃষক কার্ড’ কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে এবং ‘হেলথ কার্ড’ সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করবে বলে জানান তিনি। ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’-এর মাধ্যমে নাগরিকরা সমন্বিত সরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ১ লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগে কাজ চলছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। তারা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়, বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্ব থাকবে। শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানোর কথাও জানান তিনি।
তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণের কথাও জানান তিনি। তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে জাতীয় অগ্রগতির কাজে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
পানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ কৃষি ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে বলে জানান তিনি।
পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন তিনি।
বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে আরও যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে।
তিনি বলেন, বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। নতুন বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি তরুণদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে বাংলাদেশ। শান্তি ও সম্প্রীতিকে যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমৃদ্ধির অঞ্চলে পরিণত করার আহ্বান জানান।