চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর

কামরুল ইসলাম:

চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে এ অঞ্চলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, চট্টগ্রামের বিশাল সমুদ্রসম্পদকে কাজে লাগিয়ে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।

রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর বাঁশখালীতে এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজ সকালে আমি মাতারবাড়ীসহ চট্টগ্রামের মহেশখালী ও মীরসরাই অঞ্চল পরিদর্শন করেছি। মীরসরাই থেকে পুরো অঞ্চল হেলিকপ্টারে দেখেছি। দেখার কারণ, এই বিশাল সমুদ্র বাংলাদেশের সম্পদ। এই সমুদ্রকে ব্যবহার করে দেশের মানুষের জীবনমান উন্নত করা যায়।”

তিনি বলেন, মাতারবাড়ী থেকে মীরসরাই পর্যন্ত শিল্প-কারখানা স্থাপন করে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করা হবে। এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আনোয়ারায় চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অঞ্চলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে কয়েকশ শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। এতে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তারেক রহমান বলেন, “সেখানে সমগ্র চট্টগ্রামের মানুষ কাজ করার সুযোগ পাবে। বেকার সমস্যার সমাধান হবে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। সেই মুদ্রার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি গড়ে তুলবে।”

ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের ঘোষণা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে। এখন আর পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। এখন কাজ করার এবং দেশ গড়ার সময়।

তিনি বলেন, নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং চলতি মাসের ১৬ তারিখ থেকে মূল কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের প্রধান নারীদের হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়া হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বাঁশখালী উপজেলায় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে বলে জানান তিনি।

মা-বোনদের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু করা হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ কৃষকের পাশাপাশি লবণচাষিরাও এ সুবিধা পাবেন। লবণচাষিদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরাতে লবণের নতুন মূল্য নির্ধারণের ঘোষণাও শিগগির দেওয়া হবে। এতে লবণচাষিদের দুর্ভোগ কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নতুন পরিকল্পনা

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে হাতে গোনা কিছু ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা সেই ব্যবস্থাকে জনগণের স্বার্থে পুনর্গঠন করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এরই মধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কেমন হবে, সেই প্রস্তাবনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, যাতে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, মিল-কারখানা কিংবা বাসাবাড়ি—সব জায়গায় মানুষ নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ পায়। একই সঙ্গে গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহজে জ্বালানি পাওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হবে।

চট্টগ্রামের উন্নয়নে সহযোগিতার আহ্বান

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে চট্টগ্রামের নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে স্থানীয়দের ধৈর্য ধারণ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম থেকে আমরা দুইজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছি। একটি অর্থ মন্ত্রণালয়, আরেকটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যে অঞ্চলের দুইজন ব্যক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, সেই এলাকার উন্নয়ন কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর পিছিয়ে পড়ে থাকা যাবে না। এখন একটি লক্ষ্য ও একটি উদ্দেশ্য—তা হলো জনগণের জীবনমান উন্নত করা এবং দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন করা।

তিনি বলেন, জনগণের জন্য সরকার যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে জনগণের সমর্থন প্রয়োজন। বিএনপির সব ক্ষমতার উৎস জনগণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের সমর্থন থাকলে জনগণের স্বার্থে নেওয়া কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কর্মশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে, যাতে প্রত্যেক মানুষ দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারেন এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারেন।

বাঁশখালীর উন্নয়নে বিভিন্ন দাবি

অনুষ্ঠানে বাঁশখালীর উন্নয়নে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন অনুষ্ঠানের সভাপতি ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা। তিনি এসব দাবি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বাঁশখালীর উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাঁশখালী বর্তমানে একটি পর্যটন স্পটে পরিণত হয়েছে। লবণচাষিরা ন্যায্যমূল্য পাওয়া শুরু করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই লবণের ন্যূনতম মূল্য ঘোষণা করবেন।

তিনি বেড়িবাঁধ উন্নয়নের বিষয়েও কথা বলেন। বাঁশখালীর উন্নয়নে কোনো ধরনের বৈষম্য করা হবে না বলেও জানান তিনি।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনীতি ভিন্ন ধারার রাজনীতি। দেশের যুব সমাজ, শিশু, নারী, কৃষিজীবী, ব্যবসায়ীসহ প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষের বিষয় বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার প্রত্যেক মানুষের ঘরে ঘরে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আলেম-ওলামাদের জন্যও বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাঁশখালীর বিভিন্ন সমস্যা ও উন্নয়নকাজ সরকারের পক্ষ থেকে বাস্তবায়ন করা হবে।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাঁশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র কামরুল ইসলাম হোছাইনী ও বিএনপি নেতা রাসেল ইকবাল মিয়া।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ও বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, মো. এনামুল হক, জসীম উদ্দিন, সাচিংপ্রু জেরি, সরওয়ার নিজাম চৌধুরী, অধ্যক্ষ মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, মোহাম্মদ শাহাজাহান চৌধুরী, এনজিও ব্যুরোর মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ জকরিয়া, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া, সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন, জহিরুল ইসলাম চৌধুরী আলমগীর, বাঁশখালী উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মাস্টার মোহাম্মদ লোকমান আহমদ, আমিনুর রহমান চৌধুরী, ইব্রাহিম বিন খলিল, রেজাউল হক চৌধুরী, দেলোয়ার আজিম, অ্যাডভোকেট মো. নাছির উদ্দিন, অ্যাডভোকেট শওকত ওসমান, নাছির উদ্দিন শাওনসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

বানভাসিদের হাতে নতুন ঘরের চাবি

বাঁশখালীতে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে টিনের নতুন ঘরের চাবি তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার দুপুরে বাহারছড়া ইউনিয়নের পশ্চিম বাঁশখালীতে বন্যাকবলিত এলাকায় গিয়ে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেন।

বন্যার্তদের পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রকল্পের আওতায় নতুন ১০০টি ঘরের মধ্যে ১০টি ঘরের চাবি সরাসরি হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া ২০০ জনকে খাদ্যসামগ্রী সহায়তা এবং প্রতিবন্ধীদের মাঝে সহযোগিতা প্রদান করা হয়।

দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর সেখানে উপস্থিত হওয়ার কথা থাকলেও তিনি দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে বাঁশখালীতে পৌঁছান। পরে তিনি গৃহহারা পশ্চিম বাহারছড়ার বিধবা সাজেদা বেগমের বাড়িতে যান। সেখানে নতুন বাড়ির উদ্বোধন ও গৃহ হস্তান্তর করেন তিনি।

এ সময় নতুন বাড়ির আঙিনায় একটি মেহগনি গাছের চারাও রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য এবং হাঁস-মুরগি প্রদান করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মাসের শুরুতে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। বন্যায় শত শত মানুষের ঘরবাড়ি, পুকুর, জলাশয় ও ঘেরের মাছ পানিতে ভেসে যায়। এতে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারের পুনর্বাসনে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *