চাঁদপুর জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও প্রাণের দাবি এখন আরও জোরালোভাবে সামনে এসেছে—চাঁদপুর–কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করা এবং কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার মুদাফরগঞ্জ ও চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণ করা। স্থানীয় জনগণ ও সচেতন মহলের মতে, এই সড়ক উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
প্রায় ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ চাঁদপুর–কুমিল্লা আঞ্চলিক সড়কটি একসময় এ অঞ্চলের মানুষের ঢাকা ও চট্টগ্রামের সাথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল। বিশেষ করে নদীবেষ্টিত চাঁদপুর জেলার জন্য এই সড়কটি ছিল জীবনরেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে এই সড়কটির গুরুত্ব কমে গেছে। বর্তমানে অনেক যাত্রীই বিকল্প হিসেবে নদীপথ, রেলপথ কিংবা মতলব ও কচুয়া হয়ে আঞ্চলিক সড়ক ব্যবহার করতে পছন্দ করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কটির বেহাল অবস্থা, নিয়মিত যানজট এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এটি এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। বিশেষ করে চাঁদপুর–কুমিল্লা মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ দুটি পয়েন্ট—মুদাফরগঞ্জ ও হাজীগঞ্জ বাজার এলাকায় দীর্ঘ যানজট এখন নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যাত্রী ও পরিবহন চালকদের মতে, এই দুই এলাকায় স্বাভাবিক সময়ে পার হতে যেখানে কয়েক মিনিট লাগার কথা, সেখানে অনেক সময় এক থেকে দুই ঘণ্টাও লেগে যায়। ফলে ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামগামী যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। অনেক সময় দেখা যায়, কুমিল্লা থেকে ঢাকা পৌঁছাতে যে সময় লাগে, তার চেয়েও বেশি সময় ব্যয় হয় এই দুটি বাজার অতিক্রম করতেই।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুদাফরগঞ্জ ও হাজীগঞ্জ এলাকায় অবৈধ পার্কিং, অপরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থা এবং সড়কের সংকীর্ণতা যানজটের মূল কারণ। প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের চাপ সামলানোর মতো অবকাঠামো এখানে নেই। ফলে পুরো আঞ্চলিক সড়ক ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে চার লেন সড়ক ও ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, শুধু সড়ক প্রশস্ত করলেই হবে না, গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও জনবহুল এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণ করা জরুরি। বিশেষ করে হাজীগঞ্জ ও মুদাফ্ফরগঞ্জ এলাকায় উড়ালসড়ক নির্মাণ করা গেলে যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।
একজন স্থানীয় পরিবহন চালক জানান, “এই সড়কে এখন চলা মানেই সময়ের হিসাব মিলানো যায় না। কখনো আধা ঘণ্টার রাস্তা তিন ঘণ্টায়ও শেষ হয় না। যদি চার লেন আর ফ্লাইওভার করা হয়, তাহলে আমরা স্বস্তিতে চলতে পারব।”
অন্যদিকে সাধারণ যাত্রীদেরও একই অভিমত। তারা বলছেন, আধুনিক যুগে এসে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়কের এমন বেহাল দশা গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শুধু সময় নষ্ট হচ্ছে না, অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়ছে।
স্থানীয় উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চাঁদপুর–কুমিল্লা সড়কটি উন্নত করা গেলে এটি শুধু আঞ্চলিক যোগাযোগ নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। চাঁদপুরের মৎস্য সম্পদ, কৃষিপণ্য এবং কুমিল্লার শিল্প ও বাণিজ্য সহজে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
তবে বারবার দাবি ওঠার পরও দৃশ্যমান কোনো বড় ধরনের উদ্যোগ না থাকায় হতাশা বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। প্রশাসন মাঝে মাঝে যানজট নিরসনে অভিযান চালালেও কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাঁদপুরবাসীর আশা, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। চার লেন সড়ক ও ফ্লাইওভার বাস্তবায়িত হলে চাঁদপুর–কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়ক আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ অনেকাংশে লাঘব হবে।