অনলাইন ডেস্ক:
নিত্যদিনের ব্যয় বৃদ্ধির চাপে এখন হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। উচ্চমধ্যবিত্তদের মধ্যেও বাড়ছে জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে উদ্বেগ। অনেকের অভিযোগ, বেতন বা আয় বাড়ার তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও অন্যান্য খরচ বেড়েছে অনেক বেশি। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহণ ব্যয় কিছুটা বাড়লেও অনেক পণ্যের খুচরা দাম তার তুলনায় বেশি হারে বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বাড়তি খরচের বোঝা সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার চার দিন পরও বাজারে এর প্রভাব নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর কয়েকটি বাজার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য।
কাওরান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক ও পাইকারি আড়তদার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বগুড়া থেকে কাওরান বাজারে একটি ট্রাক আনতে খরচ হচ্ছে ১৬ হাজার টাকা। আগে এ খরচ ছিল ১৪ হাজার টাকা। প্রতি ট্রাকে ৫০ কেজির ৩০০ বস্তা চাল আনা যায়। অর্থাৎ ট্রাকপ্রতি বাড়তি ২ হাজার টাকা খরচ হওয়ায় প্রতি বস্তা চালে পরিবহণ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭ টাকা।
তার অভিযোগ, পরিবহণ ব্যয় বাড়ার অজুহাতে খুচরা পর্যায়ে মোটা চালের দাম কেজিতে প্রায় ৩ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।
যশোরের সাতমাইল বারিনগর বাজার থেকে কাওরান বাজারে বেগুন নিয়ে আসা সবজি ব্যবসায়ী মো. ইকবাল করিম ভূঁইয়া জানান, কৃষক পর্যায় থেকে তিনি প্রতি কেজি বেগুন সর্বোচ্চ ৭০ টাকা দরে কিনেছেন। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগে মাঝারি আকারের একটি ট্রাকের ভাড়া ছিল ১৮ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার টাকা।
তিনি ২ হাজার ৪০০ কেজি বেগুন পরিবহণ করেছেন। এতে বাড়তি ৩ হাজার টাকা ভাড়ার হিসাবে প্রতি কেজি বেগুনে পরিবহণ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১ টাকা ২৫ পয়সা। কিন্তু কাওরান বাজার হয়ে খুচরা পর্যায়ে সেই বেগুন বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ১২০ টাকা দরে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির আগে একই বেগুনের দাম ছিল ১০০ টাকা। অর্থাৎ পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় খুচরা পর্যায়ে দাম অনেক বেশি বেড়েছে।
যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তে কুমিল্লা থেকে পাঙাশ মাছ নিয়ে আসা ব্যাপারী মো. শাকিল বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর ট্রাকপ্রতি ভাড়া ১৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১৮ হাজার টাকা হয়েছে। এতে কেজিপ্রতি পাঙাশের পরিবহণ ব্যয় প্রায় ২ টাকা বেড়েছে। অথচ খুচরা বাজারে পাঙাশের দাম ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানান তিনি।
বাজারে পণ্যমূল্য সহনীয় ও যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, খাদ্য অধিদপ্তরের তদারকি সেল, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশন কাজ করছে। এসব সংস্থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাঠ প্রশাসন সহায়তা দিয়ে থাকে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্যসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল প্রতিদিন রাজধানীতে দুটি টিম দিয়ে অভিযান পরিচালনা করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর গত চার দিনে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম এম আরিফ পাশা জানান, সপ্তাহের প্রতিদিনই অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বাজারে তদারকি করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পণ্যের দাম বাড়ায় তদারকি আরও জোরদার করা হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে বাজার নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নজরদারি ও মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে পণ্যের মজুত, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা হবে। ক্রেতাকে ঠকালেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বিভিন্ন সংস্থা বাজার তদারকি করলেও পণ্যের দাম কমছে না। তার মতে, একাধিক সংস্থা আলাদাভাবে বাজার তদারকি করলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এ সুযোগে বিভিন্ন অজুহাত কাজে লাগিয়ে অসাধু চক্র পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য ভোক্তা অধিদপ্তরের মাত্র ৬টি টিম কাজ করছে। এই অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা দিয়ে কার্যকরভাবে ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ করা কঠিন। তাই ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে বাজার তদারকির ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরী বলেন, পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে এমনিতেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে। অনেকের আয় কমেছে বা বাড়েনি। এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রায় আরও চাপ তৈরি করেছে। বাজারে যে হারে দাম বাড়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি দামে ক্রেতাদের পণ্য কিনতে হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চার দিনে সারা দেশে ১৬৩টি টিম অভিযান পরিচালনা করেছে। এ সময় ৩১১টি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম পাওয়ায় মোট ৩৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অধিদপ্তর সূত্র আরও জানায়, রাজধানীসহ সারা দেশে কর্মকর্তারা সরাসরি বাজারে অভিযান পরিচালনা করছেন। রাজধানীতে অধিদপ্তরের ৬টি টিম কাজ করছে। এসব টিমের সঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তদারকিতে যুক্ত রয়েছেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এক সপ্তাহ আগে এর দাম ছিল ১০০ টাকা। টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি, যা আগে ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। করলা ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং পটোল ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আগে পটোলের দাম ছিল ৫০ টাকা।
খুচরা পর্যায়ে প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ টাকা, যা আগে ছিল ১৫০ টাকা। বড় দানার মসুর ডাল ৯৫ থেকে ১০০ টাকা, খোলা আটা ৫০ টাকা এবং খোলা ময়দা ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খোলা পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৭০ টাকা, যা আগের দিন ছিল ১৬৬ টাকা। আর তেলাপিয়া মাছের দামও বেড়ে কেজিপ্রতি ২৫০ থেকে ২৭০ টাকায় উঠেছে, যা আগে ছিল ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা।