টক অব দ্য টাউন রোয়াংছড়ির পিআইও মিলটন দস্তিদার: অনিয়ম ও দুর্নীতির রাজত্ব কায়েমের অভিযোগ

মোঃ রাসেল:

বিতর্ক ও সমালোচনা যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা আলোচিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মিলটন দস্তিদারের। ক্ষমতার অপব্যবহার, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ এবং ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বর্তমানে স্থানীয় জনমানসে তীব্র সমালোচনার কেন্দ্রে—তথা ‘টক অব দ্য টাউন’-এ পরিণত হয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান সদর উপজেলার নিয়মিত পিআইও মিলটন দস্তিদার গত ৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে রোয়াংছড়ি উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই একচ্ছত্র অনিয়ম ও দুর্নীতির এক দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে তুলেছেন। অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪-২০২৫ এবং ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় কর্তৃক গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতাধীন টিআর, কাবিটা ও কাবিখা প্রকল্পের সিংহভাগ বরাদ্দ তিনি নামে-বেনামে ভুয়া প্রকল্প সাজিয়ে আত্মসাৎ করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের সরলমনা ইউপি সদস্যদের প্রলুব্ধ করে কৌশলে বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্পের সভাপতি মনোনীত করা হতো। পরবর্তীতে উক্ত নামসর্বস্ব সভাপতিদের নামমাত্র লভ্যাংশ বা পার্সেন্টেজ প্রদান করে বরাদ্দের অবশিষ্ট সিংহভাগ অর্থ পিআইও দস্তিদার নিজস্ব তহবিলে কুক্ষিগত করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় মহলে তীব্র গুঞ্জন রয়েছে যে, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে কর্মস্থলে থাকাকালীন তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশে পিআইও দস্তিদার এক অঘোষিত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। তদানীন্তন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অবৈধ অর্থ বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করাতেন তিনি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি মূলত পূর্বতন সরকারের নিবেদিত এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন এবং বর্তমান জনবান্ধব সরকারের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন বলে স্থানীয় চা-দোকান থেকে শুরু করে পরিবহন স্টেশনগুলোতে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা চলছে। যোগদানের পর থেকেই তিনি প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে ১৬ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন গ্রহণের এক নতুন কুপ্রথার প্রচলন করেছেন।

অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে ২ নম্বর তারাছা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী অংতং পাড়া থেকে ছাংকিং পাড়া সংযোগ সড়কে সরেজমিনে গিয়ে এক নজিরবিহীন দুর্নীতির চিত্র পরিলক্ষিত হয়। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় ধাপে খাদ্যশস্য খাত থেকে সাড়ে ৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দের মাধ্যমে উক্ত সড়কটি মাটি দ্বারা পুনর্নির্মাণের একটি প্রকল্প নথিভুক্ত করা হয়, যার আর্থিক মূল্যমান প্রায় ৩ লাখ টাকা।

উক্ত প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের নাম ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে কোনো প্রকার সংস্কারকাজ না করেই সম্পূর্ণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, উক্ত সড়কটি বহু পূর্বেই গ্রামবাসী নিজস্ব অর্থায়নে যাতায়াতের উপযোগী করেছিলেন। অথচ সরকারি খাতায় সেই সড়ক দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা লোপাট করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সভাপতি পিআইওর সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে জানান, কর্মকর্তার নির্দেশেই তিনি কেবল নাম ধার দিয়েছিলেন; বিস্তারিত পিআইও-ই বলতে পারবেন।

এ বিষয়ে অংতং পাড়া ও ছাংকিং পাড়ার দুই কারবারি নালং খুমি ও রিওনাং খুমির সন্তান লিংনাং খুমি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,

“আমাদের দুই পাড়ায় জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সড়ক সংস্কার, মাটি কাটা কিংবা জঙ্গল পরিষ্কারের কোনো কাজ আজ পর্যন্ত করা হয়নি। আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানি না। আমরা অবিলম্বে এই অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি এবং জনসাধারণের যাতায়াতের সুবিধার্থে প্রকৃত সড়ক নির্মাণের জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন তহবিল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধকোটি টাকা সুকৌশলে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

কেবল আর্থিক দুর্নীতিই নয়, পিআইও মিলটন দস্তিদারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ ও ঔদ্ধত্যের নানাবিধ অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ, বাদানুবাদ এবং একাধিকবার মারমুখী ও চড়াও হওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এই ঘুষখোর ও দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাকে দ্রুত অপসারণ করা না হলে অচিরেই প্রশাসনিক চত্বরে আইনশৃঙ্খলা ও শৃঙ্খলাজনিত বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের কর্মচারীরা।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য গ্রহণের উদ্দেশ্যে পিআইও মিলটন দস্তিদারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে রোয়াংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাজমিন আলম তুলি জানান, অতিরিক্ত দায়িত্বে নিয়োজিত পিআইওর পরিবর্তে উপজেলায় একজন স্থায়ী পিআইও অত্যন্ত জরুরি; কারণ সার্বক্ষণিক কর্মস্থলে উপস্থিতি ব্যতীত সুচারুভাবে দাপ্তরিক কাজ সম্পাদন করা দুরূহ।

প্রকল্পে ঘুষ ও কমিশন গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন,

“ঘুষ বা কমিশনের বিষয়ে কিছু গুঞ্জন আমি শুনেছি, তবে এ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট বা লিখিত কোনো অভিযোগ এখনো আমার দপ্তরে আসেনি। সামগ্রিক বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পূর্বেই অবহিত করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রাপ্তি সাপেক্ষে তদন্তপূর্বক অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিখিত প্রতিবেদন পাঠানো হবে।”

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ গ্রামীণ জনপদের উন্নয়নের স্বার্থে এই দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকে অনতিবিলম্বে অপসারণপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *