স্টাফ রিপোর্টার:
মেধা, শ্রম ও সাফল্যের প্রত্যয়ে মুখর হয়ে উঠেছিল কুমিল্লার বরুড়ার পয়ালগাছা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলে উৎসাহিত করতে ব্যতিক্রমী শিক্ষা-চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং বরুড়া উপজেলা যুবদলের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ সেলিম মিয়াজী। অনুষ্ঠানে তিনি ঘোষণা দেন, আসন্ন টেস্ট পরীক্ষায় বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীরা শতভাগ উত্তীর্ণ হলে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের খরচ বহনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আবেগঘন বক্তব্যে সেলিম মিয়াজী বলেন, “এই স্কুলে পড়েছি, এখানেই বড় হয়েছি। এখানে আমি বিশেষ অতিথি নই, এ আমার নিজের বাড়ি।” ছাত্রজীবন থেকেই সবার সামনে কথা বলার স্বপ্ন ছিল উল্লেখ করে তিনি বিদ্যালয়ের সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের আবেগ ও সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন।
পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, একটি শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে শুধু তার নিজের মেধা ও শ্রম নয়, বাবা-মা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের নীরব ত্যাগ এবং অক্লান্ত পরিশ্রমও জড়িয়ে থাকে। যারা এবার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, তাদের হতাশ না হয়ে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “হাল ছেড়ো না, হাল ছেড়ে দিলে নিজেই শেষ হয়ে যাবে।”
বিদ্যালয়ের অতীত ফলাফল ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সমন্বয় নিয়ে একসময় সমালোচনা শুনতেন জানিয়ে সেলিম মিয়াজী সাম্প্রতিক সময়ে ইতিবাচক পরিবর্তনে সন্তোষ প্রকাশ করেন। বর্তমান শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করে তিনি পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আলোচিত অংশ ছিল সেলিম মিয়াজীর শিক্ষা-চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার্থীদের হাত তুলে অঙ্গীকার করিয়ে তিনি বলেন, আগামী টেস্ট পরীক্ষায় বিদ্যালয়ের প্রতিটি পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ হতে হবে।
তিনি বলেন, “একশ জন পরীক্ষা দিলে একশ জনই যেন পাস করে—এই চ্যালেঞ্জ নিতে পারবে?” শিক্ষার্থীরা হাত তুলে সাড়া দিলে তিনি জানান, এ লক্ষ্য অর্জিত হলে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের খরচ বিনামূল্যে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সভাপতি, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
ফলাফলের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অবহেলা বরদাশত না করার কথা জানিয়ে সেলিম মিয়াজী বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। যারা পড়াশোনায় পিছিয়ে আছে, তাদের এখন থেকেই চিহ্নিত করে বাড়তি যত্নে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করার জন্য শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের বড় স্বপ্ন দেখার আহ্বান জানিয়ে সেলিম মিয়াজী বলেন, সাফল্যের জন্য সব সময় বড় কোনো সুযোগের প্রয়োজন হয় না; মেধা ও শ্রম থাকলেই সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, “উঠতে বেশি সিঁড়ি লাগে না, একটু মেধা আর একটু শ্রম হলেই হয়।” মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ৫০ জন শিক্ষার্থীকে জাতীয় সংসদ ভবন পরিদর্শনের সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলেও আশ্বাস দেন তিনি। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সভাপতি এবং ঢাকায় গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের সঙ্গে আলোচনা করার কথা জানান তিনি।
বক্তব্যে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সেলিম মিয়াজী বলেন, “আমাকে ভালো ফল দাও, আমি তোমাদের উন্নয়ন দেব।” এই বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি শিক্ষার্থীদের বলেন, ভালো ফলাফল অর্জনের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ও একাডেমিক উন্নয়নের জন্য সহযোগিতা আদায় করা সম্ভব। শিক্ষার্থীদের ফলাফলকে বিদ্যালয়ের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় পয়ালগাছা এলাকায় একটি শিশু পার্ক ও খেলাধুলার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন সেলিম মিয়াজী। তাঁর মতে, শিশু-কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা গেলে তারা অপরাধ, মাদক ও নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে পারবে।
শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনের অপব্যবহার সম্পর্কে সতর্ক করে সেলিম মিয়াজী বলেন, পড়াশোনার প্রয়োজনে প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে এর অপব্যবহার ব্যক্তি ও পরিবার—দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতির কারণ হতে পারে।
মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি শিক্ষার্থীদের মাদক থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজে অপরাধ প্রতিরোধে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
ঐতিহ্যবাহী পয়ালগাছার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান সেলিম মিয়াজী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে তিনি অঙ্গীকার করান, “আমরা অপরাধ করব না, অপরাধ সইব না, অপরাধ হতে দেব না।”
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বাবা-মা ও শিক্ষকদের কথা মেনে চলা এবং পরিবারের ছোট ভাই-বোনেরা নিয়মিত ক্লাসে যাচ্ছে কি না, মাদক বা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কি না, সেদিকেও খেয়াল রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে সেলিম মিয়াজী আবারও তাঁর শতভাগ পাসের চ্যালেঞ্জের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। শিক্ষার্থীরা হাত তুলে সাড়া দিলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আসন্ন টেস্ট পরীক্ষায় বিদ্যালয়ের সব পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলে সেই সাফল্য শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীদের নয়, পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।