মোঃ ফেরদৌস হোসেন:
বাংলার ঐতিহ্যবাহী পোশাকের অন্যতম অনুষঙ্গ লুঙ্গি। আর এই লুঙ্গি তৈরির জন্য দেশের অন্যতম পরিচিত এলাকা সিরাজগঞ্জ। জেলার দক্ষ তাঁতিদের নিপুণ হাতে সুতা থেকে তৈরি হচ্ছে নানা রং ও নকশার লুঙ্গি। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, কারিগরদের অভিজ্ঞতা ও নিরলস শ্রমে সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি পেয়েছে দেশজুড়ে পরিচিতি। চাহিদা থাকায় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও যাচ্ছে এখানকার তৈরি লুঙ্গি।
লুঙ্গি তৈরির কাজ শুরু হয় সুতা প্রস্তুতের মাধ্যমে। প্রথমে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সুতা হ্যান্ডস করা হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সুতা প্রসেস করে নির্দিষ্ট রঙে রাঙানো হয়। রং করার পর তা শুকিয়ে নেওয়া হয়। পরে সুতায় দেওয়া হয় মাড়। এতে সুতা শক্ত ও টেকসই হয় এবং তাঁতে বুননের উপযোগী হয়ে ওঠে। এরপর প্রস্তুত করা সুতা সানায় তোলা হয়। দক্ষ কারিগরেরা সুতা পাক দিয়ে তাঁতে বসানোর জন্য প্রস্তুত করেন। সব প্রস্তুতি শেষ হলে শুরু হয় বুননের কাজ। তাঁতের খটখট শব্দের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম করে দক্ষ তাঁতিরা সুতা বুনে তৈরি করেন একটি সম্পূর্ণ লুঙ্গি।
বুনন শেষে লুঙ্গিগুলো ক্যালেন্ডার মেশিনে প্রেস করা হয়। এরপর করা হয় মান যাচাই। সবশেষে আকর্ষণীয়ভাবে প্যাকেজিং করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, মান ও চাহিদার কারণে সিরাজগঞ্জের লুঙ্গির বাজার দেশের বাইরেও তৈরি হয়েছে। তাঁতশিল্পের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত সিরাজগঞ্জ। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য তাঁত কারখানা। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। ফলে তাঁতশিল্প শুধু সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্য নয়, এটি হাজারো পরিবারের জীবন-জীবিকারও অন্যতম প্রধান অবলম্বন।
বিশেষ করে বেলকুচি উপজেলার শেরনগর, চন্দনগাতী, তামাই ও আজগড়া গ্রামের বিভিন্ন তাঁত কারখানায় প্রতিদিন ব্যস্ত সময় পার করেন তাঁতিরা। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত এসব এলাকায় শোনা যায় তাঁতের খটখট শব্দ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তারা তৈরি করছেন বিভিন্ন মান ও নকশার লুঙ্গি। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁতশিল্পে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের যন্ত্র ও প্রযুক্তি। তবে এখনও এই শিল্পের মূল শক্তি দক্ষ কারিগরদের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও নিখুঁত বুনন। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই টিকে আছে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। আর দক্ষ তাঁতিদের হাত ধরেই দেশজুড়ে সমাদৃত সিরাজগঞ্জের বিখ্যাত লুঙ্গির ঐতিহ্য আজও বেঁচে আছে।