দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষুধা সূচকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে পাকিস্তান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু বিপর্যয় ও বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাবে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তা সংকটে পড়েছে পাকিস্তান। ‘গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (জিএইচআই) ২০২৬’-এ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে দেশটি।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) ‘খাদ্য নিরাপত্তা ছাড়া নিরাপত্তা নেই’ প্রতিপাদ্যে ক্ষুধা সূচকের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। ওয়েল্টহাঙ্গারহিলফে, রুহর ইউনিভার্সিটি বোখুমের ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ল অব পিস অ্যান্ড আর্মড কনফ্লিক্ট এবং সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা হেলভেটাস যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। এ তথ্য জানিয়েছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষুধা পরিস্থিতির উন্নতি উল্লেখযোগ্যভাবে থমকে গেছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

পাকিস্তানে অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহের সুযোগও সীমিত হয়েছে। দেশটিতে অপুষ্টির হার ২০১৮ সালের ‘নিম্ন’ পর্যায় থেকে বেড়ে ‘মাঝারি’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে শিশুদের তীব্র অপুষ্টির পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ক্ষুধা সূচকের স্কোর ২৩ দশমিক ৫। ২০০০ সালে এ স্কোর ছিল ৩৭ দশমিক ৫, যা তখন ‘অতি আশঙ্কাজনক’ পরিস্থিতি নির্দেশ করেছিল। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অগ্রগতির বড় অংশই হয়েছে ২০১৮ সালের আগে।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ২০০০ সালের তুলনায় কিছুটা উন্নতি করলেও দেশ দুটিতে শিশুদের খর্বাকৃতির হার এখনো বেশি। পাকিস্তানে এ হার ধীরে ধীরে কমলেও ২০১৮ সালের পর আফগানিস্তানে কিছুটা বেড়েছে। তবে দুই দেশেই শিশু মৃত্যুর হার আগের তুলনায় কমে মাঝারি পর্যায়ে এসেছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি উচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে প্রতিবেদনটি। ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কয়েকটি এলাকায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে গড়ের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে আফগানিস্তানের ২০২৬ সালের শস্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইরানসহ দক্ষিণ এশিয়ার ২১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অপুষ্টির শিকার হয়েছেন। এ সংখ্যা বিশ্বজুড়ে অপুষ্টিতে থাকা মানুষের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

বিশ্বব্যাপীও ক্ষুধা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। প্রায় দুই দশকের অগ্রগতির পর আবারও ক্ষুধা বাড়ছে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকের স্কোর দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ১, যা ২০১৮ সালের ১৭ দশমিক ৬-এর চেয়ে খারাপ। ২০১৮ সালের পর থেকে বিশ্বের ৩২টি দেশে ক্ষুধা বেড়েছে। পাশাপাশি ৫৭টি দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা কমানোর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে না বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

সূচকের চারটি মানদণ্ডের মধ্যে অপুষ্টি, শিশুদের খর্বাকৃতি ও শিশুদের তীব্র অপুষ্টি—এই তিন ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কেবল শিশু মৃত্যুর হার কিছুটা কমেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র সংঘাতের বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাকে বৈশ্বিক পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এবং হরমুজ ও বাব আল-মানদাব প্রণালিতে নৌপরিবহন ব্যাহত হওয়ার কারণে জ্বালানি, পরিবহন ও সারের দাম বাড়ছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং কৃষ্ণসাগর দিয়ে রপ্তানিতে বিধিনিষেধের কারণে গমের দাম বৃদ্ধির ঝুঁকিও রয়েছে। এসব পরিস্থিতি স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কেনা আরও কঠিন করে তুলছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতিও সংকটকে গভীর করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা খাতে বৈশ্বিক ব্যয় ২০১৬-২০১৭ সালের পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে বিভিন্ন সংস্থাকে মানবিক সহায়তা ও জরুরি ত্রাণ কর্মসূচির বরাদ্দ কমাতে হচ্ছে।

ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় মানবিক সহায়তা এবং তথ্য সংগ্রহের বাজেটে কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বিশ্বের সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে প্রতিবেদনটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *