কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী এলাকায় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্রের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনে সশস্ত্র হামলা, গুলি ছোড়া, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় হামলাকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হাসান সাকী নামে এক নির্মাণশ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন। নিরাপত্তাকর্মীসহ আরও কয়েকজন শ্রমিককে মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু ওই ভবনটিই নয়, বড়দিঘির পাড় এলাকার আরও কয়েকটি নির্মাণাধীন ভবনকেও একই চক্র চাঁদাবাজির জন্য টার্গেট করেছে। এ ঘটনায় পাহাড়তলী এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী, নির্মাণাধীন ভবনের মালিক ও বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গত রোববার সকাল ৯টার দিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড়দিঘির পাড় এলাকায় চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের পূর্ব পাশে নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবনে এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি টেম্পোযোগে মুখে মাস্ক পরা ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল নির্মাণাধীন ভবনটির সামনে এসে নামে। এ সময় ভবনে কয়েকজন নির্মাণশ্রমিক কাজ করছিলেন। হামলাকারীরা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে প্রথমে দুই রাউন্ড গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এরপর শ্রমিকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা ভবনের বিভিন্ন কক্ষ, দরজা-জানালা ও নির্মাণসামগ্রী ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে নির্মাণশ্রমিক হাসান সাকীকে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। নিরাপত্তাকর্মীসহ আরও কয়েকজন শ্রমিককে বেধড়ক মারধর করা হয়। পরে হামলাকারীরা ভবনের সামনে তিনটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এতে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, হাটহাজারী এলাকায় তার চাল ও চিনির পাইকারি ব্যবসা রয়েছে। বড়দিঘির পাড় এলাকায় তিনি একটি ১০ তলা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করার পর থেকেই অজ্ঞাত ব্যক্তিরা বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে তার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন।
তার অভিযোগ, প্রায় এক মাস ধরে বিভিন্ন সময় ফোন করে চাঁদার টাকা দাবি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। বিষয়টি তিনি আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকদিন চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী চক্রের তৎপরতা কিছুটা কম থাকলেও গত এক সপ্তাহ ধরে আবারও ফোন করে চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল।
জসিম উদ্দিনের দাবি, চাঁদা না দেওয়ার কারণেই পরিকল্পিতভাবে তার নির্মাণাধীন ভবনে হামলা চালানো হয়েছে। হামলার ঘটনায় তিনি থানায় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বড়দিঘির পাড় এলাকায় বর্তমানে অন্তত ৮ থেকে ১০টি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এসব ভবনের মালিকদের অনেকের কাছেই একই কায়দায় ফোন করে চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। তবে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকেই বিষয়টি প্রকাশ্যে বলতে চাইছেন না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অতীতে এ এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনকে কেন্দ্র করে এভাবে সংঘবদ্ধভাবে চাঁদাবাজির অভিযোগ খুব একটা শোনা যায়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সশস্ত্র হামলা, গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
এদিকে নগরীর চকবাজার এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বড়দিঘির পাড়ে একই ধরনের হামলার ঘটনায় বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে।
গত ১৩ জুলাই নগরীর চকবাজার এক্সেস রোডে ডিডিএন নামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে দেশীয় অস্ত্র হাতে একদল ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখাতে দেখা যায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় চাঁদা দাবির অভিযোগে মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের নাম উল্লেখ করা হয়। পরে র্যাব ও পুলিশের অভিযানে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যেই বড়দিঘির পাড়ে নির্মাণাধীন ভবনে হামলার ঘটনা নগরীতে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্রের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন উদ্যোক্তাকে লক্ষ্য করে চাঁদাবাজির অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে হুমকি, সংঘবদ্ধভাবে হামলা, গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
তাদের মতে, নির্মাণকাজ শুরু করার পর যদি ব্যবসায়ী ও ভবন মালিকদের নিয়মিতভাবে চাঁদাবাজির হুমকির মুখে পড়তে হয়, তাহলে নগরীর উন্নয়ন ও বিনিয়োগ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে শ্রমিক ও নিরাপত্তাকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্তের কাজ চলছে। ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে দৈনিক স্বাধীন সংবাদ ও দৈনিক বাংলাদেশ পত্রিকার চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় প্রধান গত রাতে জানিয়েছেন, ঘটনার বিষয়ে মামলা রুজুর প্রক্রিয়া চলছে।
স্থানীয়রা বলছেন, হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং চাঁদাবাজির নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে বড়দিঘির পাড়সহ পাহাড়তলী এলাকার নির্মাণাধীন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সাম্প্রতিক একের পর এক ঘটনায় পাহাড়তলী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।