স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল:
নগরীর পরিবেশ, জলাশয় ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিরূপ প্রভাবের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বালু সরবরাহে ব্যবহৃত অবতরণ কেন্দ্রগুলোর কার্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশন। একই সঙ্গে এসব কেন্দ্রের ইজারার মেয়াদ আর না বাড়ানো এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত বালু সরবরাহের পাইপলাইন অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক (মেয়রের দায়িত্বে) অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের নির্দেশনা অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) রুম্পা সিকদারের স্বাক্ষর করা ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের চিঠিতে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে জানানো হয়েছে। চিঠির অনুলিপি বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার, বিএমপি পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সিটি করপোরেশনের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নগর এলাকায় বালু অবতরণ কেন্দ্রের জন্য ১৮টি কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে বর্তমানে ১৩টি কেন্দ্র কার্যকর রয়েছে। এসব কার্যাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও তা অনুমোদন করা হয়নি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, পরিবেশবিদদের মতামত এবং জনসাধারণের আবেদনের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে গত ২৭ আগস্ট সিটি করপোরেশনের পরিচালনা কমিটির সাধারণ সভায় বিষয়টি আলোচনা হয়। সভার ৭ নম্বর আলোচ্যসূচির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নগরীর বালু অবতরণ কেন্দ্রগুলোর কার্যাদেশ বাতিল এবং ইজারার মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ইজারাদারদের বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকার বালু সরবরাহের পাইপলাইন অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে অবহিত করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের চিঠিতে বালু সরবরাহের পাইপলাইন ব্যবস্থার কারণে নগরীর বিভিন্ন স্থানে জলাশয় ও জমি ভরাট, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। কিছু এলাকায় রাস্তার ওপর দিয়ে পাইপলাইন নেওয়ার ফলে সড়কের স্বাভাবিক ব্যবহার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পাইপের মাধ্যমে বালু পরিবহনের সময় আশপাশের জমি ও জলাশয়ে বালু পড়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায়ও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ও তীরের স্বাভাবিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। এর প্রভাবে নদীতীরবর্তী বসতি, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্য ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকে। অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর জলজ পরিবেশ ও মাছের আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বরিশাল নদীবেষ্টিত নগরী হওয়ায় নদী ও জলাশয় রক্ষা এবং নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সিটি করপোরেশনের এ সিদ্ধান্তের পর নগরীর বালু সরবরাহ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা বালু সরবরাহের বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তনে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ অসন্তুষ্ট হতে পারে—এমন আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে, সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যসহ তা যাচাই করে প্রকাশ করা হবে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, বালু অবতরণ কেন্দ্র ও পাইপলাইন অপসারণের সিদ্ধান্ত শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবেশ, নদী, জলাশয় ও সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি আইনসম্মতভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবহনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা হবে।