বরুড়ায় মডেল মসজিদ উদ্বোধন করলেন গণপূর্তমন্ত্রী, কৃষকের হাতে তুলে দিলেন আধুনিক যন্ত্রপাতি

মোঃ আনজার শাহ:

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় আজ এক ঐতিহাসিক দিনের সাক্ষী হলো স্থানীয় জনগণ। ধর্মীয় অনুভূতি, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি আর কৃষকের স্বপ্নপূরণ একই দিনে একই উপজেলায় মিলে গেল এক অনন্য আয়োজনে। রবিবার (১৭ মে ২০২৬) দুপুরে নবনির্মিত মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। একই অনুষ্ঠানে তিনি গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন কাজের শুভ উদ্বোধন করেন এবং কৃষকদের হাতে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি তুলে দেন।

ঐক্যের বার্তা নিয়ে এলো নতুন মসজিদ—

সুদৃশ্য স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মডেল মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়, এটি ইসলামী জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করল আজ। মসজিদ সংলগ্ন ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের হলরুমটি ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামী সংস্কৃতি চর্চা এবং সামাজিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন উপস্থিত বক্তারা।

উদ্বোধনী বক্তব্যে মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, ইসলাম ধর্মের মূলনীতিতে আমরা সকলেই এক। ছোটখাটো মতভেদ ও দ্বন্দ্বকে পেছনে ফেলে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এই মসজিদ সেই ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠুক। তিনি আরও বলেন, যিনি এই মসজিদের জন্য জমি প্রদান করেছেন, তাঁর এই মহৎ ত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মসজিদের হক আদায় করা আমাদের সকলের দায়িত্ব এবং সেই দায়িত্ব পালনে আমরা কেউ যেন পিছিয়ে না থাকি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ আবু হানিফ এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ বজলুর রশীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বরুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান রনি। উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

গ্রামীণ পথের বুকে উন্নয়নের ছোঁয়া—

মসজিদ উদ্বোধনের পর গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী বরুড়া উপজেলার গালিমপুর, শিলমুড়ী দক্ষিণ ও ভবানীপুর ইউনিয়নে ১ হাজার ৫০০ মিটার গ্রামীণ মাটির রাস্তা টেকসইকরণে হেরিং বোন বন্ড (HBB) নির্মাণকাজের শুভ উদ্বোধন করেন। দীর্ঘদিন ধরে কষ্টকর যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যে থাকা এই এলাকার মানুষের জন্য এটি এক নতুন আশার আলো। এই সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হলে স্থানীয় কৃষি পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন যাতায়াত পর্যন্ত সবকিছুতেই নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষকের হাতে আধুনিকতার চাবিকাঠি—

দিনটিকে আরও স্মরণীয় করে তুলল কৃষকদের হাতে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণের মুহূর্তটি। কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং বাংলাদেশ সরকারের Bangladesh Sustainable Recovery, Emergency Preparedness and Response Project (B-STRONG) প্রকল্পের আওতায় বরুড়া উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ওয়ার্ডভিত্তিক একটি করে মোট ১৩৬টি কৃষক গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি গ্রুপে ৩০ জন সদস্য রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ৩০ শতাংশই নারী কৃষক। সকল সদস্যকে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

বরুড়া উপজেলার কৃষি খাতে জলাবদ্ধতা, মাটির অম্লতা বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় কৃষক গ্রুপগুলোর মধ্যে এলএলপি পাম্প, ক্যানভাস হোস পাইপ, ধান কাটার মেশিন, ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, ধান মাড়াই যন্ত্র, ন্যাপস্যাক হ্যান্ড স্প্রেয়ার, ফুট পাম্প এবং বেড প্লান্টার বিতরণ করা হয়। এই যন্ত্রপাতি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাবে, শ্রমিক সংকট লাঘব করবে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী বছরগুলোতে বাকি গ্রুপগুলোর কাছেও একইভাবে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে, যাতে বরুড়ার কৃষি সত্যিকার অর্থেই বাণিজ্যিক ও আধুনিক রূপ নিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *