মোঃআনজার শাহ
চোখ মানুষের অমূল্য সম্পদ। অথচ অর্থাভাবে বহু মানুষ সময়মতো চোখের চিকিৎসা করাতে পারেন না, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীর কাছে চক্ষু চিকিৎসা প্রায়ই থেকে যায় সাধ্যের বাইরে। এমন মানুষের পাশে দাঁড়াতেই কুমিল্লার বরুড়ায় আয়োজন করা হয়েছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও রোগী বাছাই কার্যক্রম।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের পেরুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দিনব্যাপী এই চিকিৎসা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মসূচিতে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চোখের নানা সমস্যা নিয়ে ছুটে আসেন সব বয়সের নারী-পুরুষ। প্রায় এক হাজার রোগীর চোখ পরীক্ষা করে বিভিন্ন চক্ষু রোগ শনাক্ত করা হয়, রোগী বাছাই করা হয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সাধারণ রোগীদের বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধও সরবরাহ করা হয়।
চিকিৎসা কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন বরুড়া জনকল্যাণ সমিতির সভাপতি ও তথ্য এবং সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. শাহ আলম। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বরুড়া জনকল্যাণ সমিতি মানবিক ও জনকল্যাণমূলক নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বন্যা, শীত ও খরাদুর্গতদের সহায়তাসহ বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে সংগঠনটি সম্পৃক্ত।
তিনি আরও বলেন, চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রমটি একটি অত্যন্ত মানবিক উদ্যোগ। ভবিষ্যতে এই কার্যক্রম আরও ব্যাপক পরিসরে সম্প্রসারণ করে বরুড়ার প্রতিটি ইউনিয়নে সারা বছরব্যাপী চক্ষু চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সংগঠনের।
দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বিনামূল্যে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন রোগীরা। দীর্ঘদিন চোখের সমস্যায় ভুগেও অর্থাভাবে চিকিৎসা নিতে না পারা মানুষের জন্য এই আয়োজন ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
চিকিৎসা নিতে আসা পয়েলগাছা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি চোখের সমস্যায় ভুগছিলেন, কিন্তু অর্থাভাবে নিয়মিত চিকিৎসা করাতে পারেননি। বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ পেয়ে তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তাঁর চোখে ছানি ধরা পড়েছে এবং অপারেশনের জন্য তাঁকে কুমিল্লা চক্ষু হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এই চিকিৎসা কার্যক্রমে ১৮ জন চিকিৎসকের একটি বিশেষজ্ঞ টিম রোগীদের সেবা দেয়। চিকিৎসকরা জানান, চোখের ছোটখাটো সমস্যাকেও অবহেলা করা উচিত নয়, কারণ সময়মতো চিকিৎসা না নিলে তা অনেক সময় জটিল রূপ নিতে পারে। তাই নিয়মিত চোখ পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।
শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না এই আয়োজন। যেসব রোগীর চোখে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন, তাঁদের মধ্য থেকে প্রায় ১০০ জনকে বিশেষ ব্যবস্থায় কুমিল্লার আলেখারচর চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে অপারেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অপারেশনের পাশাপাশি এসব রোগীর যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা, ওষুধ এবং চশমা প্রদানের ব্যবস্থাও করা হয়েছে ফলে অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের চোখের চিকিৎসার বড় একটি প্রতিবন্ধকতা দূর হয়েছে।
আয়োজকদের ভাষ্যমতে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের দোরগোড়ায় চক্ষু চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়াই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। এই মানবিক উদ্যোগে সহযোগিতা করেছে আরবিস ইন্টারন্যাশনাল। সার্বিক সহযোগিতায় ছিল বরুড়া উপজেলা জনকল্যাণ সমিতি, ঢাকা এবং পুরো চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি, কুমিল্লা।
আয়োজনটি সফল করতে সার্বিক সহযোগিতা করেন বরুড়া জনকল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মো. মনির হোসেন। চিকিৎসা কার্যক্রম চলাকালে উপস্থিত ছিলেন সমিতির নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় রাজনীতিবিদ, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এ ধরনের মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতে বরুড়ার আরও ইউনিয়নে সম্প্রসারিত হবে, যাতে অর্থাভাবে চিকিৎসাবঞ্চিত আরও অসংখ্য মানুষ বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসার সুযোগ পান।