মোঃ আনজার শাহ
বাংলা ভাষায় কুরআনের সুফি তাফসিরচর্চাকে আরও বিস্তৃত, গবেষণামুখী ও প্রাতিষ্ঠানিক একাডেমিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট আলেম, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সুফি সাধকরা। তারা বলেছেন, কুরআনের যাহিরি বিধান ও বাতিনি তাৎপর্যকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে না দেখে এর অন্তর্নিহিত সম্পর্ক ও গভীরতর তাৎপর্য অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে কুরআন-ভাবনার একটি সমৃদ্ধ জ্ঞানভিত্তিক পরিসর নির্মাণ করা সম্ভব।
এই প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে খাজা ওসমান ফারুকী (খাজাজী) রচিত গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘সিররুল কুরআন (ভূমিকা পর্ব)’-এর প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর এশিয়া হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে ‘সিররুল কুরআন: খাজা ওসমান ফারুকীর কুরআন-ভাবনা ও সুফি তাফসিরের বহুমাত্রিক দিগন্ত’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে সুফি তাফসিরের সুদীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে গবেষণাভিত্তিক, বোধগম্য ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে উপস্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ‘সিররুল কুরআন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কুরআনের অর্থ, ভাষা, বয়ান, তাফসির ও তাদাব্বুর, মুহকাম ও মুতাশাবিহ, যাহির ও বাতিন, আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং কুরআনের বহুমাত্রিক তাৎপর্য নিয়ে গ্রন্থটিতে যে অনুসন্ধানী পরিসর নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে, তা ভবিষ্যৎ গবেষণার নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
খ্যাতিমান দার্শনিক অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভাটি সঞ্চালনা করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওসমান গনী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুস সবুর খান।
অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক ছিলেন পীরে তরিকত ড. মাওলানা এ কে এম মাহবুবর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুর রশীদ, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খান, পীরে তরিকত ড. মাওলানা সৈয়দ এমদাদ উদ্দীন নিজামপুরী, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন, ডা. মনজুরে মুরশেদ, অধ্যাপক ড. তওহীদুল হাসান, অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম, পীরে তরিকত শাহ সরোয়ার মুস্তফা আবুলউয়াল্যী, শায়খ উছমান গনী, প্রফেসর ড. শাহ নূরে মুক্তাদির আল সুরেশ্বরী, মাওলানা সৈয়দ ফারহান হোসাইন বরিয়াবরী, লায়ন নূরুল ইসলাম, মেহেদী হাসান, নাইমুল ইসলাম, ডা. ইযহার আবুলউলায়ী, মুফতি মাওলানা হোসাইন রেজা ও মুফতি মাওলানা রিয়াজ উদ্দীনসহ বিশিষ্টজনেরা।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, কুরআনকে কেবল পাঠ ও ব্যাখ্যার বিষয় হিসেবে দেখলে এর অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিগন্তের একটি বড় অংশ অনালোচিত থেকে যেতে পারে। মানুষের অন্তর্জগত, নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির ক্ষেত্রে কুরআনের যে গভীর তাৎপর্য রয়েছে, সুফি তাফসির সেই দিকগুলোকে বিশেষভাবে অনুসন্ধান করে।
তারা আরও বলেন, ঐতিহ্যবাহী সুফি তাফসিরের জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে আধুনিক জ্ঞানতত্ত্ব, দর্শন, মনস্তত্ত্ব ও চেতনা-গবেষণার একটি সৃজনশীল সংলাপ গড়ে তোলা সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে কুরআন-ভাবনাকে কেবল ধর্মীয় ব্যাখ্যার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের আত্মিক, নৈতিক ও মননশীল বিকাশের বৃহত্তর পরিসরে বিশ্লেষণের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
‘সিররুল কুরআন’ প্রচলিত অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ তাফসিরগ্রন্থ নয়। বরং কুরআনের গভীরতর পাঠ এবং সুফি তাফসিরের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি অন্বেষণের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে গ্রন্থটি রচিত হয়েছে। কুরআনের গভীরে প্রবেশের আগে কুরআনকে কীভাবে পাঠ করা উচিত, পাঠের পদ্ধতি কী, এর অর্থ ও তাৎপর্যের বিভিন্ন স্তর কীভাবে অনুধাবন করা যায়—এসব মৌলিক প্রশ্নকে সামনে রেখে পাঠকের সঙ্গে একটি অনুসন্ধানী সংলাপ তৈরির প্রয়াস রয়েছে গ্রন্থটিতে।
গ্রন্থটির রচয়িতা খাজা ওসমান ফারুকী (খাজাজী) বলেন, “কুরআনের গভীরে প্রবেশের আগে কুরআনকে কীভাবে পাঠ করতে হবে—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর সঙ্গে পাঠকের একটি প্রাথমিক সংলাপ তৈরি করাই ‘সিররুল কুরআন’-এর অন্যতম উদ্দেশ্য।”
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে খাজাজী প্রকাশনা উৎসবে উপস্থিত অতিথি, আলোচক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, পীর-মাশায়েখ, সাংবাদিক ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বাংলা ভাষায় সুফি তাফসির, কুরআন-ভাবনা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানচর্চাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বক্তারা বাংলা ভাষায় সুফি তাফসির ও কুরআন-ভাবনার গবেষণামূলক চর্চাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন পরিসরে এ বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা, আলোচনা ও পাঠক্রম গড়ে উঠলে বাংলা ভাষায় ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের একটি শক্তিশালী একাডেমিক ভিত্তি নির্মাণ সম্ভব।
সুফি সেন্টার আয়োজিত এ প্রকাশনা উৎসবের মধ্য দিয়ে ‘সিররুল কুরআন’ বাংলা ভাষায় সুফি তাফসির ও কুরআন-ভাবনার একটি নতুন গবেষণামুখী পরিসর নির্মাণের প্রত্যয় নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। কুরআনের বহুমাত্রিক তাৎপর্য অনুসন্ধানের এই প্রয়াস ভবিষ্যতে বাংলা ভাষায় সুফি তাফসিরচর্চাকে আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশাই উঠে এসেছে অনুষ্ঠানের আলোচনা থেকে।