বাইশারী গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণের শঙ্কা: খোলা স্থানে সিরিঞ্জ, অদক্ষ কর্মীর হাতে পরীক্ষা ও টিকা

বরিশাল প্রতিনিধি:

সেবা দেওয়ার কথা ছিল মানুষের দোরগোড়ায়; কিন্তু সেই সেবাকেন্দ্রের ভেতরেই সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এমন অভিযোগ উঠেছে বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের ‘গ্রামীণ স্বাস্থ্য কল্যাণ’ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, সূচ ও রক্তমাখা চিকিৎসাবর্জ্য যথাযথভাবে নিষ্পত্তি না করে কেন্দ্রের পেছনের খোলা স্থানে ফেলে রাখা হচ্ছে। অদক্ষ কর্মীদের দিয়ে ল্যাবের রক্ত ও রাসায়নিকযুক্ত সামগ্রী ধোয়া হচ্ছে। সেই দূষিত পানি গিয়ে পড়ছে পাশের খোলা নর্দমায়। এতে আশপাশের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, সূচ ও রক্তসম্পর্কিত বর্জ্য আলাদা করে নিরাপদ পদ্ধতিতে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তি করার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ইন-হাউস বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত জনবল ও নিয়মিত তদারকির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

খোলা স্থানে সিরিঞ্জ-সূচ:
স্থানীয়দের দাবি, চিকিৎসাকাজে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, সূচ ও রক্তমাখা বর্জ্য শোধন বা নিরাপদে ধ্বংস না করেই কেন্দ্রের পেছনের খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্য অপসারণের কাজ করানো হচ্ছে অদক্ষ কর্মী দিয়ে।
এ ছাড়া ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত রক্ত ও রাসায়নিকযুক্ত টেস্টটিউবও অদক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে বেসিনে ধোয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সেই দূষিত পানি পাশের খোলা নর্দমায় গিয়ে পড়ছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানান এলাকাবাসী।
তাঁদের আশঙ্কা, এভাবে চিকিৎসাবর্জ্য ছড়িয়ে পড়লে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, এইচআইভি ও অন্যান্য সংক্রমণজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এসব রোগ ছড়িয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞদের সরেজমিন তদন্ত প্রয়োজন।

সনদহীন কর্মীদের হাতে টিকা ও রক্ত পরীক্ষা:
কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সনদ বা পেশাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য সহকারীদের দিয়ে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন টিকা দেওয়ানো হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, হেপাটাইটিস বি, প্যাপিলোভ্যাক্স, ইনফ্লুভ্যাক্স টেট্রা, প্রিনোভ্যাক্স ও টিটেনাসের মতো টিকা দেওয়ার কাজে প্রশিক্ষিত ও অনুমোদিত স্বাস্থ্যকর্মীর বদলে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে রোগীদের রক্ত সংগ্রহ করে সাধারণ এইচবিএসএজি কিটের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ, নমুনা সংরক্ষণ ও ফল যাচাইয়ের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় ভুল ফলাফলের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
তাঁদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য সহকারীরাই তাৎক্ষণিকভাবে রোগীদের পজিটিভ বা নেগেটিভ ফল জানিয়ে দিচ্ছেন এবং সেই ফলের ভিত্তিতে টিকা প্রয়োগ করছেন। ভুল ফলের ভিত্তিতে চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে রোগীর জন্য তা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সনোগ্রাফারের হাতে জটিল আল্ট্রাসনোগ্রাম:
কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে জটিল আল্ট্রাসনোগ্রামের রিপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, একজন সনোগ্রাফারকে দিয়ে এককভাবে লোয়ার অ্যাবডোমেন ও হোল অ্যাবডোমেনের মতো পরীক্ষার রিপোর্ট তৈরি করানো হচ্ছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, যথাযথ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছাড়া এ ধরনের রিপোর্ট তৈরি করা হলে ভুল রোগ নির্ণয়ের আশঙ্কা থাকে। সম্প্রতি ভুল বা অনভিজ্ঞ রিপোর্টিংয়ের কারণে এক রোগী গুরুতর শারীরিক ঝুঁকিতে পড়েছেন বলেও তাঁরা দাবি করেন। তবে ঘটনাটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

‘বিশেষজ্ঞ’ পরিচয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগ:
সেবার আড়ালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঢাকা থেকে মেডিকেল অফিসার এনে রোগী দেখানোর পর তাঁদের অনেককে অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
বিভিন্ন মেডিকেল ক্যাম্প ও প্রচারণায় সাধারণ মেডিকেল অফিসারদের নামের পাশে ‘বিশেষজ্ঞ’ পদবি ব্যবহার করে রোগীদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। নামমাত্র খরচে সামাজিক সেবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতোই রোগীদের কাছ থেকে চড়া ফি নেওয়া হয় বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি:
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা বলেন, স্বাস্থ্যসেবার নামে কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি চিকিৎসাবর্জ্য খোলা স্থানে ফেলা হয়, অদক্ষ কর্মীদের দিয়ে পরীক্ষা ও টিকা দেওয়ানো হয় এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়, তাহলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি।
তাঁরা গ্রামীণ স্বাস্থ্য কল্যাণ কেন্দ্রটির কার্যক্রম দ্রুত তদন্ত, চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিদর্শন, কর্মীদের সনদ যাচাই এবং ল্যাব ও আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবার মান পরীক্ষা করার দাবি জানান। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন ও লাইসেন্স যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা ২০০৮ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য নিরাপদে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাতেও প্রশিক্ষিত জনবল, নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তদারকির কথা বলা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *