মোঃ রাসেল:
পার্বত্য জেলা বান্দরবানে স্থানীয়ভাবে ইট উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্মাণকাজে সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাব দেখা দিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বাড়িঘর নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই ইটের চাহিদা পূরণে নির্ভর করতে হচ্ছে পার্শ্ববর্তী জেলার ওপর। এতে ইটের দাম ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ অবকাঠামো, আবাসন খাত ও জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে আধুনিক প্রযুক্তিতে ইট উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও বান্দরবানে এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে না। অন্যদিকে, একশ্রেণির অসাধু চক্র বান্দরবান সদর উপজেলার সোয়ালক, মাঝেরপাড়াসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে পাহাড়ের মাটি ও গাছ কেটে পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও কেরানীহাট এলাকার ইটভাটায় নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে পাহাড় ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ওইসব এলাকায় উৎপাদিত ইটই বেশি দামে কিনে বান্দরবানে আনতে হচ্ছে। ফলে স্থানীয়ভাবে ইটভাটা বন্ধ রাখার মাধ্যমে পরিবেশের সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বান্দরবান সদর, রুমা, থানচি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা উপজেলায় সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবন নির্মাণের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু স্থানীয়ভাবে ইট উৎপাদন না থাকায় বাইরের জেলা থেকে ইট আনতে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এতে নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ বিপাকে পড়েছেন। পাশাপাশি বাড়তি খরচের কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
লামা উপজেলার বাসিন্দা মো. শাহাজান বলেন, “নিজের একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে গিয়ে বাইরে থেকে ইট আনতে হচ্ছে। ইটের মূল দামের চেয়ে গাড়িভাড়া আর শ্রমিক খরচই বেশি পড়ে যাচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতি না করে সরকার যদি নিয়ম মেনে এখানে আধুনিক প্রযুক্তিতে ইট উৎপাদনের ব্যবস্থা করে, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ বাঁচবে এবং এলাকার উন্নয়নও গতি পাবে।”
ইটভাটা বন্ধ থাকায় স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একটি ইটভাটাকে কেন্দ্র করে শ্রমিক, গাড়িচালক, পরিবহন শ্রমিক, মাটি সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি হতো। স্থানীয়ভাবে এ খাত বন্ধ থাকায় অনেকেই কাজের সুযোগ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক জানান, কাজের অভাবে তাঁরা আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের ভাষ্য, তাঁরা নতুন কর্মসংস্থান চান, তবে পরিবেশ ধ্বংস করে এমন কোনো কার্যক্রম সমর্থন করেন না।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করা প্রয়োজন। পরিবেশবান্ধব ও নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তিতে সরকারি নজরদারির মাধ্যমে ইট উৎপাদনের ব্যবস্থা করা গেলে নির্মাণ ব্যয় কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
পাহাড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে—এমন প্রত্যাশা বান্দরবানবাসীর।