বান্দরবান সদর হাসপাতাল: ২৫০ শয্যার কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না, স্বাস্থ্যসেবায় চরম দুর্ভোগ

মোঃ শামীম হোসেন সিকদার:

বান্দরবান পার্বত্য জেলার লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল বান্দরবান সদর হাসপাতাল। জেলার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন এই হাসপাতালে। দীর্ঘদিনের শয্যা সংকট ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা দূর করতে ১০০ শয্যার হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে প্রায় সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ১০ তলা বিশিষ্ট নতুন ভবন।

কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে ভবনটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বান্দরবানের সাধারণ মানুষ। প্রশাসনিক অনুমোদন, প্রয়োজনীয় জনবল, চূড়ান্ত বিদ্যুৎ সংযোগসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে নতুন ভবনে এখনো পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে একদিকে পড়ে আছে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ভবন, অন্যদিকে পুরোনো ও অপ্রতুল অবকাঠামোতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

মেঝে ও বারান্দাই যেন রোগীদের ভরসা

সরেজমিনে বান্দরবান সদর হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের পুরোনো ভবনে প্রতিদিনই রোগীর চাপ বাড়ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা রোগীদের পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষও চিকিৎসার জন্য এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু রোগীর তুলনায় হাসপাতালের বিদ্যমান শয্যা সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় অনেক রোগীকে মেঝে ও বারান্দায় অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগীদের স্বজনরা। অসুস্থ শিশুদের নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে হাসপাতালে এসে পর্যাপ্ত জায়গা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় অনেক অভিভাবককে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বান্দরবানের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অনেক প্রত্যন্ত এলাকা থেকে জেলা সদরে আসতেই রোগীদের দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে হয়। এরপর হাসপাতালে এসে যদি প্রয়োজনীয় শয্যা ও চিকিৎসাসেবা না পাওয়া যায়, তাহলে রোগীর দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

সংকটাপন্ন রোগীদের পাঠানো হচ্ছে চট্টগ্রামে

হাসপাতালে পর্যাপ্ত আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় গুরুতর ও জটিল রোগীদের অনেক সময় উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বিশেষ করে সংকটাপন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও বান্দরবান থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তরের কারণে সময়ক্ষেপণ ও অতিরিক্ত যাতায়াতের ঝুঁকি তৈরি হয়।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, পাহাড়ি জেলা হওয়ায় বান্দরবান থেকে চট্টগ্রামে যাতায়াত সহজ নয়। একজন সংকটাপন্ন রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে সড়কপথের দূরত্ব ও যানবাহনের ব্যবস্থা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে জেলা সদরেই যদি উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে অনেক রোগীকে আর চট্টগ্রামে পাঠানোর প্রয়োজন হবে না।

স্থানীয় অভিভাবকদের প্রশ্ন, এত বড় একটি নতুন ভবন নির্মাণের পরও যদি সেখানে চিকিৎসাসেবা চালু করা না যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের কষ্ট কখন কমবে? তারা দ্রুত নতুন ভবনটি চালু করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১০ তলা ভবন

স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান সদর হাসপাতালের পুরোনো অবকাঠামোর ওপর চাপ কমাতে এবং জেলার মানুষের জন্য আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রায় সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ তলা বিশিষ্ট নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

নতুন ভবনটিতে আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০টি আইসিইউ বেড, ৫টি সিসিইউ বেড, ২০টি আইসোলেশন বেড, আধুনিক সার্জারি ও গাইনি ইউনিট, রোগী ও চিকিৎসকদের জন্য পৃথক আধুনিক ওয়ার্ড এবং লিফট সুবিধা।

এছাড়া হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার ফলে জেলার রোগীদের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি গুরুতর রোগীদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

বান্দরবান জেলার রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, আলীকদমসহ বিভিন্ন দুর্গম উপজেলা থেকে প্রতিদিন রোগীরা চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে আসেন। এসব এলাকার অনেক মানুষ আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে যাওয়া তাদের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

স্থানীয়দের মতে, বান্দরবান সদর হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসাসেবা চালু করা গেলে পাহাড়ি এলাকার দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য তা বড় ধরনের স্বস্তি বয়ে আনবে। বিশেষ করে জরুরি মুহূর্তে আইসিইউ, সিসিইউ ও উন্নত সার্জারি সুবিধা চালু থাকলে সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।

তারা বলছেন, নতুন ভবনটি শুধু একটি ভবন নয়; এটি পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতীক। তাই ভবনটি নির্মাণের পর সেটি খালি পড়ে থাকলে এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন করে ভবনটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন।

রোগীদের স্বজনদের ক্ষোভ

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বজনদের অনেকেই নতুন ভবনটি দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, নতুন ভবনটি নির্মাণের পরও পুরোনো ভবনে রোগীর চাপ কমেনি। ফলে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে রোগীদের ভিড় দেখা যায়।

একাধিক রোগীর স্বজন বলেন, হাসপাতালে এসে শয্যা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শিশু ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নিয়েও মেঝেতে অবস্থান করতে হয়। এতে রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি স্বজনদেরও নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

ক্ষুব্ধ অভিভাবকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আর কত শিশুর কষ্ট ও মৃত্যু দেখলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে?’ তাদের দাবি, নতুন ভবনটি দ্রুত চালু করে শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হোক।

জনবল ও বিদ্যুৎ সংযোগের জটিলতা

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ভবনটি চালু করতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না; প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ প্রয়োজনীয় জনবল। পাশাপাশি বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন ও সেগুলো পরিচালনার জন্য কারিগরি সক্ষমতাও প্রয়োজন।

এ ছাড়া চূড়ান্ত বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনসহ আরও কিছু প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয় রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় নতুন ভবনে পূর্ণাঙ্গভাবে চিকিৎসাসেবা চালু করা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বান্দরবান সদর হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মতে, নতুন ভবনে আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও রূপরেখা প্রস্তুত রয়েছে। ভবন হস্তান্তর, চূড়ান্ত বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল পদায়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই ভবনটির কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, নতুন ভবন চালু হলে হাসপাতালের শয্যা সংকট অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি রোগীদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা বাড়বে এবং গুরুতর রোগীদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

দ্রুত চালুর দাবি

স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বান্দরবানের মতো পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলে একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেলার সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য বারবার চট্টগ্রামে ছুটতে হলে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে, অন্যদিকে জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ জীবনঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তাদের মতে, নতুন ২৫০ শয্যার ভবন চালু হলে বান্দরবান সদর হাসপাতালের ওপর থাকা দীর্ঘদিনের চাপ অনেকটাই কমে আসবে। বিশেষ করে আইসিইউ ও সিসিইউ সুবিধা চালু হলে সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এ অবস্থায় পাহাড়ের দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অনতিবিলম্বে সব প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতা নিরসন, প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত এবং নতুন ভবনের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী রোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

তাদের প্রত্যাশা, কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক ১০ তলা ভবনটি দ্রুত চালু হলে বান্দরবানসহ আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘদিনের শয্যা সংকট, মেঝেতে চিকিৎসা নেওয়ার দুর্ভোগ এবং জরুরি রোগীদের চট্টগ্রামে স্থানান্তরের প্রবণতাও অনেকাংশে কমে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *