স্টাফ রিপোর্টার:
বরিশাল নগরীর কাশিপুর এলাকায় ট্রাক টার্মিনাল ও হাই স্কুলসংলগ্ন কোটি টাকা মূল্যের সরকারি খাস জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে হেলাল উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে জাল কাগজপত্র তৈরি, মালিকানা দাবি এবং মামলা দিয়ে দুই বৃদ্ধা নারীকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মৃত সোনা মিয়া চৌধুরীর ওয়ারিশদের ভোগদখলে থাকা জমি নিয়ে বিরোধের সুযোগ নিয়ে একসময় মামলা পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া হেলাল উদ্দিন পরবর্তীতে ওই জমির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে অসুস্থ ও নিরক্ষর দুই বৃদ্ধা নারীকে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাশিপুর হাই স্কুল ও ট্রাক টার্মিনালসংলগ্ন ওই জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। পরিবারের দাবি, মৃত সোনা মিয়া চৌধুরীর মৃত্যুর পর স্থানীয় দুলাল মোল্লা জমিটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা চলমান থাকায় এবং পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ২০১২ সালে মামলা পরিচালনা ও আইনি বিষয় দেখভালের জন্য কাশিপুর এলাকার আকরাম আলীর ছেলে হেলাল উদ্দিনকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা আমমোক্তারনামা দেওয়া হয়।
পরিবারটির অভিযোগ, ওই ক্ষমতাপত্রের সুযোগ নিয়ে পরবর্তীতে হেলাল উদ্দিন জমিটির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন এবং জমির মালিকানা-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাগজপত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরিবারের দাবি, জমিটি সরকারি খাস জমি হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে ক্রয়-বিক্রয়ের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে জমিটির প্রকৃত আইনগত অবস্থান সরকারি রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে বিএস রেকর্ডে সোনা মিয়া চৌধুরীর ওয়ারিশদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। একই সময়ে সরকার জমিটি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিলে হেলাল উদ্দিন নিজেকে জমিটির একক মালিক দাবি করে অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ পাওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট নথি ও গেজেটে প্রকৃত ওয়ারিশদের নাম থাকায় তার ওই দাবি গ্রহণ করা হয়নি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এরপর থেকেই বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তাদের দাবি, ২০১৭ সাল থেকে হেলাল উদ্দিনের পক্ষ থেকে চেক ডিজঅনারসহ বিভিন্ন দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা করা হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসেও তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে তারা জানান।
অভিযোগের বিষয়ে বৃদ্ধা রানু বেগম বলেন, জমি-সংক্রান্ত মামলার সুবিধার কথা বলে বিভিন্ন সময় তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা পড়াশোনা জানি না। কোথায় কী কাগজে স্বাক্ষর করেছি, তা বুঝতে পারিনি। পরে জানতে পারি, আমাদের অজান্তে বিভিন্ন কাগজপত্রে আমাদের স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা কাউকে কোনো চেক দিইনি। অথচ আমাদের বিরুদ্ধে চেক ডিজঅনারের মামলা করা হয়েছে।”
রানু বেগম আরও জানান, তিনি অসুস্থ ও অসচ্ছল। বর্তমানে নিজের স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় লুৎফুর রহমান সড়ক এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। বয়সের শেষ প্রান্তে এসে একের পর এক মামলার কারণে তিনি আর্থিক ও সামাজিকভাবে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বলেও দাবি করেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সোনা মিয়া চৌধুরী ও তার ছেলে চান মিয়ার মৃত্যুর পর বর্তমানে তাদের দুই মেয়ে রানু বেগম ও ফাতেমা (পারুল) বেগম জীবিত রয়েছেন। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের মামলা ও জমি-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে দুই বৃদ্ধা নারী চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের আরও অভিযোগ, হেলাল উদ্দিন বিভিন্ন সময় বিএনপির নাম ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব দেখিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব ব্যবহার করে অসহায় পরিবারটির সম্পত্তি ও বসতভিটা দখলের চেষ্টা করা হয়ে থাকলে সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের আরও অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব দেখিয়ে তিনি স্থানীয়ভাবে নিজের প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। হেলাল উদ্দিনের বিএনপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক, দলীয় পদ-পদবি কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দলীয় নথি ও দায়িত্বশীল নেতাদের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে জমি-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক সিনিয়র সাংবাদিককে মুঠোফোনে গালাগালি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ওই সাংবাদিকের সঙ্গে হেলাল উদ্দিনের কথোপকথনের একটি কল রেকর্ডিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
কল রেকর্ডিংয়ে ওই সিনিয়র সাংবাদিককে অশালীন ভাষায় গালাগালি করা এবং বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিষয়টি শোনা যায়। সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের বিষয় নিয়েও তাকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে জানা গেছে। একই কথোপকথনে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কথা উল্লেখ করে হুমকিসূচক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টিও শোনা যায়।
ভুক্তভোগী সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, “আমি সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করছিলাম। এ সময় আমাকে মুঠোফোনে গালাগালি করা হয় এবং বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়। কথোপকথনের পুরো বিষয়টি আমার কাছে রেকর্ড করা ছিল। পরে সেই কল রেকর্ডিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে বিষয়টি সামনে আনছি না। একজন সাংবাদিক হিসেবে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করাই আমার দায়িত্ব। রাজনৈতিক দলের নাম বা পরিচয় ব্যবহার করে কোনো সাংবাদিককে ভয় দেখানো বা সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হলে সেটি অবশ্যই তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
কল রেকর্ডিংয়ে হেলাল উদ্দিনকে বিএনপির সঙ্গে তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কথা বলতে এবং নিজেকে ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের সাবেক ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শোনা যায়। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে তার পরিচয় ও প্রভাবের কথাও তিনি উল্লেখ করেন বলে কল রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়।
ওই সাংবাদিকের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তাকে ভয় দেখানোর পাশাপাশি সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী দুই নারী ও তাদের পরিবারের দাবি, জমির প্রকৃত মালিকানা, বিএস রেকর্ড, গেজেট, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র, অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত নথি এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর প্রকৃত ভিত্তি—সবকিছু একসঙ্গে যাচাই করে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।
তাদের অভিযোগ, কোনো স্বাক্ষর জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না এবং মামলা দায়েরের পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
ভুক্তভোগী পরিবার বলছে, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিরোধে যেতে চায় না। তাদের দাবি—সরকারি নথি ও আইন অনুযায়ী জমির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ, কথিত জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত, মামলাগুলোর প্রকৃত ভিত্তি যাচাই এবং দুই বৃদ্ধা নারীর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
এদিকে সাংবাদিককে গালাগালি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ, কল রেকর্ডিংয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব দেখানোর বিষয় এবং বিএনপির নাম ব্যবহারের অভিযোগও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক।