বিতর্কিত কর্মকর্তা এরশাদ উদ্দিনকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে বদলি

মোঃ মনির হোসেন:

চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. এরশাদ উদ্দিনকে বদলি করে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদায়ন করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ শাখা থেকে গত ২৩ জুলাই জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মো. এরশাদ উদ্দিনকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব পদে বদলি করা হয়েছে। তাঁর নতুন কর্মস্থলে যোগদানের পর চাঁদপুরের জেলা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এই পদে নতুন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।

এরশাদ উদ্দিনের বদলির বিষয়টি স্বাভাবিক প্রশাসনিক রদবদলের অংশ হলেও তাঁর অতীতের একটি বিভাগীয় শাস্তির ঘটনা সামনে আসায় এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে তাঁর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত করা হয়েছিল। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাঁকে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়।

কী ছিল অভিযোগ

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রজ্ঞাপন ও সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়, এরশাদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে তাঁর স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন এবং একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত করা হয়।

প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় এবং অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। এরশাদ উদ্দিন লিখিতভাবে তাঁর জবাব দাখিল করেন। পাশাপাশি তিনি ব্যক্তিগত শুনানির সুযোগও চান।

পরে তাঁর ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানির পর অভিযোগের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনা, বক্তব্য গ্রহণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

সরকারি নথিতে বলা হয়, তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

দুই বছরের জন্য বেতন গ্রেডের নিম্ন ধাপে অবনমন

অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী এরশাদ উদ্দিনকে ‘লঘুদণ্ড’ দেওয়া হয়। শাস্তি হিসেবে তাঁকে দুই বছরের জন্য বেতন গ্রেডের নিম্নতর ধাপে অবনমন করা হয়েছিল।

সরকারি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছিল, ওই সময় তিনি ষষ্ঠ গ্রেডের বেতন স্কেলে কর্মরত ছিলেন। তাঁর মূল বেতন ছিল ৫২ হাজার ৪৮০ টাকা। শাস্তির ফলে তাঁকে ষষ্ঠ গ্রেডের বেতন স্কেলের নিম্নতম ধাপ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়।

অর্থাৎ লঘুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সময় তাঁর মূল বেতন কমে যায় ১৬ হাজার ৯৮০ টাকা। তবে এটি স্থায়ীভাবে তাঁর বেতন কমিয়ে দেওয়ার শাস্তি ছিল না। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, নির্ধারিত দুই বছরের দণ্ডের মেয়াদ শেষ হলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের বেতন ধাপে ফিরে যাবেন।

তবে শাস্তির কারণে যে সময়ের জন্য বেতন কমে গিয়েছিল, সেই সময়ের বকেয়া আর্থিক সুবিধা তিনি পাবেন না বলেও সরকারি আদেশে উল্লেখ করা হয়েছিল।

বিভাগীয় মামলার প্রক্রিয়া যেভাবে এগোয়

সরকারি নথির তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগ ওঠার পর প্রথমে প্রাথমিক তদন্ত করা হয়। সেখানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা করা হয়। এরপর তাঁকে কৈফিয়ত তলব করা হয়।

এরশাদ উদ্দিন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব দেন। পরে ব্যক্তিগত শুনানিতে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। শুনানির পর অভিযোগের বিষয়ে আরও অধিকতর তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করলে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী তাঁকে অবনমিতকরণসূচক লঘুদণ্ড দেওয়া হয়।

এখানে উল্লেখ্য, বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি সরকারি নথিতে উল্লেখ থাকলেও এটি অতীতের একটি প্রশাসনিক শাস্তির ঘটনা। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগ বা নতুন করে বিভাগীয় শাস্তির তথ্য এই বদলি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়নি।

বিসিএস ৩৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা এরশাদ উদ্দিন

মো. এরশাদ উদ্দিন বিসিএস ৩৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা। সরকারি চাকরিজীবনে তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

পূর্বে তিনি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের উপপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পদে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হিসেবে দায়িত্ব পান।

চাঁদপুরে দায়িত্ব পালনকালে জেলা প্রশাসনের সার্বিক প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সমন্বয় এবং জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়ে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্ব

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২৩ জুলাইয়ের প্রজ্ঞাপনে এখন তাঁকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে তাঁর বদলির কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থ’ উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি চাকরিতে নিয়মিত বদলি ও পদায়নের অংশ হিসেবে এ ধরনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়ে থাকে। তবে এরশাদ উদ্দিনের ক্ষেত্রে আগের বিভাগীয় শাস্তির তথ্য থাকায় তাঁর নতুন পদায়ন নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে শুধু বদলি বা পদায়নের প্রজ্ঞাপন থেকে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগ রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমান বদলি আদেশে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগ, বিভাগীয় মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়নি।

আগের শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর

সরকারি নথি অনুযায়ী, এরশাদ উদ্দিনকে যে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তার মেয়াদ ছিল দুই বছর। এই সময়ের জন্য তাঁকে বেতন গ্রেডের নিম্নতর ধাপে অবনমন করা হয়। শাস্তির মেয়াদ শেষ হলে তিনি আগের বেতন ধাপে ফিরে যাওয়ার বিধানও ছিল।

অর্থাৎ বিভাগীয় শাস্তির ফলে তাঁর বেতন স্থায়ীভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়নি। নির্ধারিত সময় শেষে পূর্বের বেতন ধাপে ফিরে যাওয়ার সুযোগ ছিল। তবে শাস্তির সময়ের আর্থিক ক্ষতি বা বেতন পার্থক্যের বকেয়া তিনি পাবেন না বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এদিকে অতীতের সেই শাস্তির তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা, বিভাগীয় তদন্তের কার্যকারিতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে অতীতের শাস্তির বিষয়গুলো কীভাবে বিবেচনা করা হয়—এসব বিষয় নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

চাঁদপুর থেকে বিদায়

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নতুন আদেশের ফলে চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) পদ থেকে বিদায় নিচ্ছেন মো. এরশাদ উদ্দিন। নতুন কর্মস্থল রেলপথ মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।

চাঁদপুরে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তাঁর পূর্বের বিভাগীয় শাস্তির ঘটনাও এখন আলোচনায় এসেছে। তবে ২৩ জুলাই জারি করা বদলি প্রজ্ঞাপনে তাঁর পূর্বের শাস্তির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

সরকারি নথির তথ্য বলছে, অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অসদাচরণের অভিযোগ বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁকে বিধি অনুযায়ী লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সেই শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

বর্তমান প্রজ্ঞাপনে তাঁকে জনস্বার্থে চাঁদপুর থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে এবং আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এখন নতুন কর্মস্থলে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্বের নতুন অধ্যায় শুরু হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *