নৈতিকস্খলনের অভিযোগে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার, কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এবং মুফতি আমির হামজার বিতর্কিত বক্তব্যকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে চাপে পড়েছে জামায়াতে ইসলামী। তবে দলটির দাবি, অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে তারা কোনো ধরনের আপস করছে না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬৮টি আসনে জয় এবং প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ৯টি সংরক্ষিত নারী আসন পাওয়ার পর সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখছে জামায়াত। এর মধ্যেই দলটির কয়েকজন জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে।
গাজী নজরুলকে বহিষ্কার
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয় গত জুলাইয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সমালোচনার মধ্যে পড়েন তিনি। পরে ভিডিওতে থাকা নারীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম বলে দাবি করেন নজরুল।
জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরীণ তদন্তে তার বিরুদ্ধে নৈতিকস্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে তার সদস্যপদ বাতিলের ব্যবস্থা নিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে চিঠি দেয় দলটি।
এরপর গত ২০ সেপ্টেম্বর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম বেগমের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন গাজী নজরুল।
তবে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও এখনো তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়নি।
আমির হামজার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক
জামায়াতের সংসদ সদস্য ও ইসলামি বক্তা মুফতি আমির হামজার কয়েকটি বক্তব্য নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। নারী সংসদ সদস্যদের নিয়ে আপত্তিকর ও বডি শেমিং মন্তব্যের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হয়েছে।
এ ছাড়া এক মন্ত্রীকে ‘নাস্তিক’ ও ‘ইসলামবিদ্বেষী’ বলে মন্তব্য করার অভিযোগেও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন আদালত।
তবে গাজী নজরুলের ক্ষেত্রে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও আমির হামজার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত একই ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা দেখা যায়নি। এ নিয়ে দলটির ভেতরে ও বাইরে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উঠেছে
জামায়াতের কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সরকারি অনুদান ও ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও সামনে এসেছে।
নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকায় তার মেয়ের নামে দুই দফায় ১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সংসদ সদস্য অবশ্য দাবি করেন, তার প্যাডে দেওয়া অগ্রিম স্বাক্ষর ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সহকারী ওই তালিকা তৈরি করেছিলেন। পরে তিনি ব্যক্তিগত সহকারীকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন।
রংপুরের পীরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে আত্মীয়স্বজনকে সভাপতি করার অভিযোগ ওঠে। খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধেও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ বিতরণে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে।
এসব অভিযোগের পর দলীয়ভাবে সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে জামায়াত। সরকারি অনুদান, ত্রাণ বা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, ব্যক্তিগত সহকারী, ব্যক্তিগত সচিব বা তাদের স্বজনদের জন্য সুপারিশ বা বরাদ্দ না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিএনপির পদক্ষেপের সঙ্গেও তুলনা
এদিকে গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।
ঘটনার পর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম শাখা ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। বিএনপি ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকেও সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ফলে সাম্প্রতিক সময়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর দলীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পেয়েছে।
জামায়াতের দাবি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে দলটি আপসহীন। তিনি বলেন, মানুষের সংগঠনে ব্যক্তি হিসেবে কিছু ভুলত্রুটি হতে পারে। তবে অভিযোগের পর দল দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুমও দাবি করেন, দলের কেউ অন্যায় বা অনৈতিক কাজে জড়িত হলে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তার ভাষ্য, কয়েকজন সংসদ সদস্যের স্বজনপ্রীতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর কেন্দ্র থেকে সার্কুলার দিয়ে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করার পাশাপাশি তার সংসদ সদস্যপদ বাতিলের জন্য স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ভিন্নমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, জামায়াতের মতো নীতি ও নৈতিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া একটি রাজনৈতিক দলের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ দলটির ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে অভিযোগ ওঠার পর দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, জামায়াত যে ধরনের নীতি ও নৈতিকতার কথা বলে, কিছু ঘটনা তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীও মনে করেন, জামায়াতের একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে নৈতিকস্খলনের অভিযোগ ওঠার পর তাকে দ্রুত বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, একজন ব্যক্তি ভুল করতে পারেন, কিন্তু জামায়াতের কাছ থেকে মানুষ এ ধরনের ঘটনা আশা করে না। তবে অভিযোগের পর দলটির দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিত।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
জামায়াত এখন সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ফলে দলের সংসদ সদস্য ও নেতাকর্মীদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা ও নৈতিক অবস্থানও জনপরিসরে আরও বেশি পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকবে।
একদিকে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযোগ ওঠার পর দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা—দুই দিকই এখন জামায়াতের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির আলোচনায় উঠে এসেছে। দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, ব্যক্তিগত পর্যায়ের বিতর্ক যেন দলীয় আদর্শ ও সাংগঠনিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে, তা নিশ্চিত করা।