ময়মনসিংহে বিজিবির গুলিতে যুবক নিহত, মামলায় নিহত ব্যক্তিও আসামি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তে বিজিবির চোরাচালানবিরোধী অভিযানের সময় হামলা ও গুলিতে মো. রুমান মিয়া নামে এক যুবক নিহতের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলায় নিহত রুমানসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের (৩৯ বিজিবি) কড়াইতলী বিওপির কোম্পানি কমান্ডার নায়েক রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

মামলার অন্য দুই আসামি হলেন হালুয়াঘাটের সংগ্র গ্রামের আতিকুল ইসলাম (৪০) ও শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা গ্রামের আবদুল্লাহ (৩৫)।

হালুয়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জালাল উদ্দিন জানান, বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছে।

এজাহারে যা বলা হয়েছে

মামলার এজাহার অনুযায়ী, সোমবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে হালুয়াঘাট সীমান্তের ১১১৯ নম্বর সীমান্ত পিলার থেকে বাংলাদেশের ভেতরে প্রায় এক হাজার গজ দূরে জলজলিয়া এলাকায় ভারত থেকে অবৈধ পথে চারটি গরু আনার খবর পান বিজিবি সদস্যরা। পরে সেখানে গিয়ে গরুগুলো জব্দ করেন তাঁরা।

এজাহারে বলা হয়েছে, গরু নিয়ে ফেরার পথে জলজলিয়া এলাকায় বিজিবি সদস্যদের পথ আটকান চোরাকারবারিরা। তাঁদের হাতে দেশীয় অস্ত্র, ধারালো রামদা ও বাঁশের লাঠি ছিল। এ সময় হামলাকারীরা বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে দুটি গরু ছিনিয়ে নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এজাহার অনুযায়ী, হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কড়াইতলী বিওপির কোম্পানি কমান্ডার নায়েক রফিকুল ইসলাম চারটি ফাঁকা গুলি ছোড়েন। এরপরও হামলা অব্যাহত থাকলে একপর্যায়ে রামদা দিয়ে তাঁর হাতের আঙুলে কোপ দেওয়া হয়। পরে আরেক ব্যক্তি তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে ধস্তাধস্তির মধ্যে অস্ত্র থেকে গুলি বেরিয়ে যায় এবং রুমান গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় অন্য বিজিবি সদস্যদেরও মারধর করে আহত করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

পরিবারের দাবি, চোরাচালানে জড়িত ছিলেন না রুমান

রুমানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁর স্বজনেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। সোমবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত হালুয়াঘাট পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের থানা রোড এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তাঁরা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

নিহত রুমানের ছোট ভাই আবু রায়হান দাবি করেন, ফোন পেয়ে তাঁর ভাই জলজলিয়া গ্রামে গিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে বিজিবি তাঁর ভাইকে গুলি করে। রুমান স্থানীয় বাজারের ইজারাদার ছিলেন এবং চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বলেও দাবি করেন তিনি। বাজার থেকে কেনা গরুর কাগজপত্র দেখাতে রুমান সেখানে গিয়েছিলেন বলে জানান তাঁর ছোট ভাই।

ভুবনকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল জব্বার বলেন, ভারতীয় গরু বাজারে বিক্রির জন্য আনা হলে রুমান কাগজপত্র তৈরি করে দিতেন। তবে তিনি গরু চোরাচালানে জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করেন আবদুল জব্বার।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত গরু আসে এবং এ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিজিবির সঙ্গে সাপ্তাহিক অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

বিজিবির বক্তব্য

বিজিবির ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নুরুল আজিম বায়েজীদ বলেন, ওই দিন চোরাকারবারিরা বেপরোয়া আচরণ করে ধারালো অস্ত্র ও লাঠি দিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলা চালান। ফাঁকা গুলি ছোড়ার পরও তাঁরা থামেননি; বরং পেছন থেকে এক বিজিবি সদস্যের ওপর আক্রমণ করেন। এ সময় ধস্তাধস্তির মধ্যে অস্ত্র থেকে গুলি বেরিয়ে একজনের গায়ে লাগে।

বিজিবির সঙ্গে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে অধিনায়ক বলেন, এ ধরনের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়। কেউ প্রমাণসহ অভিযোগ দিলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোনো চোরাকারবারিকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ঘটনাটি নিয়ে বিজিবির বক্তব্য, নিহতের পরিবারের দাবি এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ—সবকিছুই তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। মামলার তদন্তে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি ও দায় নির্ধারিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *