মাছের ঘেরের গ্রাসে বিলীন হচ্ছে বরুড়ার সড়ক, ঝুঁকিতে হাজারো মানুষের চলাচল

বরুড়া (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় মাছের ঘেরের কারণে ভাঙনের মুখে পড়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। কোথাও কোথাও সড়কের অর্ধেকেরও বেশি অংশ ধসে পুকুরে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও পথচারীরা। ব্যাহত হচ্ছে যানবাহন চলাচল ও পণ্য পরিবহন; বেড়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
সড়কের সীমানা থেকে কমপক্ষে ১০ ফুট দূরে পুকুর বা মাছের ঘের খননের বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে বিধিবিধান লঙ্ঘন করে ঘের তৈরি করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
২০ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার আদ্রা ইউনিয়নের মনোহরপুর মুন্সিবাড়ি থেকে নোয়াগাঁও ভূঁইয়াবাড়ি পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে মাটি ধসে পড়েছে। সড়কের দুই পাশে থাকা ছোট-বড় মাছের ঘেরের কারণে কোথাও কোথাও সড়কের উল্লেখযোগ্য অংশ ভেঙে পুকুরে বিলীন হয়ে গেছে। সড়ক সংকুচিত হওয়ায় যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
একই ইউনিয়নের অশ্বদিয়া বাজারসংলগ্ন নোয়াগাঁও সড়কের দিঘিরপাড় থেকে নরিন্দ্রপুরের সিরাজ মেম্বারের বাড়ি পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ঝলম ইউনিয়নের ষোলাপুকুরিয়া থেকে বরুড়ার সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সড়কগুলোর বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়লেও তা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মাছের ঘেরের পাড়ে পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় ভাঙন ক্রমশ বাড়ছে। এসব সড়ক দিয়ে প্রতিদিন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, পথচারী ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাভাবিক যাতায়াতের পাশাপাশি কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে।
মনোহরপুর গ্রামের বাসিন্দা ইয়াকুব বলেন, “এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে মানুষের খুব কষ্ট হয়। গাড়ি নিয়ে চলাচলও কঠিন। জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার না করলে ভাঙা অংশগুলো অচিরেই পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে। ঘেরের মালিকেরা যেন দ্রুত সড়কটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।”
পথচারী আল-আমিন বলেন, “সড়কের বিভিন্ন জায়গায় অর্ধেকের বেশি অংশ ভেঙে মাছের প্রজেক্টে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে রাস্তার প্রস্থ অনেক কমে গেছে। ভাঙা অংশ দিয়ে চলাচলের সময় গাড়ি উল্টে মালামালের ক্ষয়ক্ষতি এবং মানুষ আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো সড়কই মাছের ঘেরে বিলীন হয়ে যেতে পারে।”
নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মোস্তফা কামাল ভূঁইয়া বলেন, মাছের ঘেরের কারণে তাঁদের চলাচলের রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে। যানবাহন চলাচলে চরম অসুবিধা হচ্ছে। অটোরিকশা নিয়েও ওই সড়কে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি অসুস্থ রোগীকে ছোট যানবাহনে করে বাড়ি থেকে বের করতেও সমস্যায় পড়তে হয়। তিনি দ্রুত সড়কটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে মনোহরপুর মুন্সিবাড়িসংলগ্ন একটি মাছের ঘেরের মালিক মোহাম্মদ আমিন বলেন, ঘেরটি অনেক আগে থেকেই রয়েছে। ১০ থেকে ১৫ বছর আগে সেখানে ধান চাষের পাশাপাশি মাছ চাষ করতেন তিনি। ঘেরটি খুব বেশি গভীর নয় বলেও দাবি করেন তিনি। বর্তমানে ঘেরটি তোফাজ্জল হোসেনের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। তাঁকে দ্রুত সড়ক ও ঘেরের পাড় মেরামত করতে বলেছেন বলে জানান আমিন।
সড়কের পাশে মাছের ঘের তৈরির সরকারি বিধিবিধান সম্পর্কে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আমিন বলেন, এ বিষয়ে তাঁর সঠিক ধারণা নেই। তবে বিষয়টি জেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। মাছচাষি তোফাজ্জল হোসেন বলেন, “আমি বেশিদিন হয়নি ঘেরটি ভাড়া নিয়েছি। ঘেরের মেয়াদ বাড়ানো হলে ডিসেম্বরের মধ্যে পাড় মেরামতের কাজ করব।”
বরুড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুরাইয়া জামান নিতু বলেন, মাছচাষিদের নিয়ে বিভিন্ন সময় সভা-সমাবেশ করে তাঁদের সতর্ক করা হয় এবং আইন মেনে মাছের ঘের নির্মাণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপরও কেউ কেউ বিধিবিধান উপেক্ষা করে মাছের প্রজেক্ট তৈরি করায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্মিলিতভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বরুড়া উপজেলা প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, বেআইনিভাবে কেউ মাছের প্রজেক্ট খনন করলে এবং এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, ১৯৯৬ সালের বিধি ২৮ অনুযায়ী নিজ ভূমির সীমানা থেকে কমপক্ষে ১০ ফুট ভেতরে পুকুর বা মাছের ঘের সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। সরকারি রাস্তার সীমানা থেকে কমপক্ষে ১০ ফুট দূরে এবং ৪৫ ডিগ্রি ঢাল রেখে পুকুর বা মাছের ঘের খনন করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বরুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামান রনি বলেন, সরকারি আইন না মেনে মাছের ঘের তৈরি ও চাষাবাদের কারণে উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন সড়ক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা চাইলে ঘেরমালিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনের বিধান থাকা সত্ত্বেও তার যথাযথ প্রয়োগ ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো দ্রুত সংস্কার, মাছের ঘেরের পাড়ে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত এবং বিধিবিধান লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাঁদের মতে, শুধু আশ্বাস নয়, সড়ক রক্ষায় প্রয়োজন দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *