আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় এক নবজাতক শিশুসহ অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের একটি অস্থায়ী প্রসূতি ক্লিনিক এবং থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী কায়াহ রাজ্যের একটি স্কুলে পৃথক হামলায় এ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এসব হামলায় নারী, শিশু, স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষার্থীরাও হতাহত হয়েছেন। স্থানীয় জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী, ত্রাণকর্মী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বরাত দিয়ে সোমবার এ তথ্য জানা গেছে। হামলার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ ও নিন্দার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে চিকিৎসাকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলার অভিযোগ ওঠায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার পশ্চিম রাখাইন রাজ্যের চারটি শহরে বিমান হামলা চালায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। রাজ্যটির অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া আরাকান আর্মি রাজধানী সিত্তের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় কয়েক সপ্তাহ ধরে সেখানে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে হারানো ভূখণ্ড পুনর্দখলে সামরিক বাহিনীর অভিযান জোরদারের মধ্যেই এসব হামলার ঘটনা ঘটে। আরাকান আর্মির একজন মুখপাত্র ও একজন ত্রাণকর্মীর দাবি, কিয়াকতাওয়ের একটি সেতু, কিয়াকফিউ ও পাউকতাওয়ের বিভিন্ন এলাকা এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ম্রাউক-ইউ শহরের একটি অস্থায়ী ক্লিনিক ও প্রসূতি বিভাগে হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছেন।
ম্রাউক-ইউ শহরের একটি অস্থায়ী ক্লিনিক ও প্রসূতি বিভাগে হামলার ঘটনায় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় ত্রাণকর্মী ওয়াই হুন অং জানিয়েছেন, হামলায় ক্লিনিকের ভবনটি ধসে পড়লে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে এক সপ্তাহ বয়সী একটি নবজাতক কন্যাশিশুর মৃত্যু হয়। শিশুটির যমজ বোন বেঁচে রয়েছে। হামলার পরদিনই শিশুটিকে নিয়ে পরিবারের বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই বিমান হামলায় ক্লিনিকটি ধ্বংস হয়ে যায়। ওই ত্রাণকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় স্বাস্থ্যকর্মীসহ আরও চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা মানুষদের এমন একটি স্থাপনায় হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী কায়াহ রাজ্যের লোইকাও শহরের একটি স্কুলেও বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার ক্লাস চলাকালে সামরিক বাহিনীর চালানো এ হামলায় তিন শিক্ষার্থী নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছে বলে সোমবার জানিয়েছে স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা কারেনি হিউম্যান রাইটস। কারেনি ইন্টেরিম এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের আহ্বায়ক বানিয়ার খুন অং এবং মানবাধিকার সংগঠনটির দাবি, একটি ওয়াই-১২ পরিবহন বিমান ও একটি যুদ্ধবিমান থেকে স্কুলটিতে ২০টিরও বেশি বোমা নিক্ষেপ করা হয়। তাঁদের ভাষ্য, হামলার সময় ওই এলাকায় কোনো সামরিক তৎপরতা কিংবা সংঘর্ষের ঘটনা ছিল না।
স্কুলে হামলার বিষয়ে বানিয়ার খুন অং বলেন, ছোট ছোট শিশুরা যেখানে পড়াশোনা করছে, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বারবার হামলা চালানো চরম অমানবিক কাজ। তাঁর মতে, এ ধরনের হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে মিয়ানমারের সংঘাত সীমান্তবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডেও উদ্বেগ বাড়ছে। সংঘাতের প্রভাব থাই ভূখণ্ডে পড়ার পাশাপাশি দেশটির সীমান্তবর্তী এলাকায় বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং থাইল্যান্ডের ভূখণ্ডে অন্তত একজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে থাই যুদ্ধবিমান আকাশে টহল দিচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার।
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল বলেছেন, তাঁর সরকার মিয়ানমারকে সতর্কতার সঙ্গে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে চলমান সংঘাতের প্রভাব থাইল্যান্ডের ওপর না পড়ে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা ও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, হামলার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী-সমর্থিত সরকারের একজন মুখপাত্র তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। এর আগে দেশটির সরকার দাবি করে আসছিল, বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈধ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক হামলায় বেসামরিক মানুষ, চিকিৎসাকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, কয়েক বছর ধরে বিচ্ছিন্নতা ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যে থাকা মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন সরকার আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া এলাকাগুলো পুনর্দখলে সামরিক অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ক্লিনিক ও স্কুলে সাম্প্রতিক বিমান হামলার ঘটনা দেশটির চলমান সংঘাতের মানবিক সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।