মিয়ানমারে সিমেন্ট, সার, ডিজেল ও ওষুধ পাচার বেড়েছে

কামরুল ইসলাম:

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, বৈধ বাণিজ্য কার্যক্রমে স্থবিরতা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটকে ঘিরে বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, সার, ডিজেল, ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় সংঘবদ্ধ একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এসব পণ্য পাচার করে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট ও সার জব্দ এবং বেশ কয়েকজনকে আটক করা হলেও থামছে না এই অবৈধ বাণিজ্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং বৈধ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় নির্মাণসামগ্রী, কৃষি উপকরণ ও জ্বালানি পণ্যের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এর সুযোগ নিচ্ছে বাংলাদেশভিত্তিক কিছু পাচারকারী চক্র। বাংলাদেশে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া এসব পণ্য সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা, কক্সবাজারের টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন সংলগ্ন সমুদ্রপথ এবং নাফ নদীকে ব্যবহার করা হচ্ছে চোরাচালানের প্রধান রুট হিসেবে। বিশেষ করে মিয়ানমারের মংডু এলাকায় এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকায় পাচারকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

মিয়ানমারে বর্তমানে এক বস্তা সিমেন্টের দাম বাংলাদেশি বাজারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। গত সপ্তাহে রাখাইনে এক বস্তা সিমেন্ট ৩২ হাজার থেকে ৪২ হাজার কিয়াত পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশে একই পরিমাণ সিমেন্ট তুলনামূলক অনেক কম দামে পাওয়া যায়। এই বড় ধরনের মূল্য ব্যবধান পাচারকারীদের জন্য বড় মুনাফার সুযোগ তৈরি করেছে।

একইভাবে মিয়ানমারে সারের দামও অস্বাভাবিক বেড়েছে। দেশটিতে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সার বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার কিয়াত এবং ডিএপি সার প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার কিয়াত পর্যন্ত। ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদিত সারও পাচারের ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের সিইউএফএল, কাফকো ও ডিএপি সার কারখানার উৎপাদিত সারের একটি অংশ সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি কোস্টগার্ডের এক অভিযানে তিনটি কার্গো নৌকা থেকে ২ হাজার ৪০০ বস্তা সিমেন্ট এবং ২৫০ বস্তা ডিএপি সার জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় ২২ জনকে আটক করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত ওই অভিযানে জানা যায়, জব্দ করা এসব পণ্য মিয়ানমারের মংডু এলাকায় পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। তদন্তে আরও উঠে আসে, সারের বস্তায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) লোগো ব্যবহার করে পণ্যের পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

এর আগে বঙ্গোপসাগর হয়ে রাখাইনে সার পাচারের সময় কোস্টগার্ডের অভিযানে ১১ জনকে আটক করা হয়। এছাড়া নৌবাহিনীর অভিযানে কুতুবদিয়া উপকূল থেকে ৬৫০ বস্তা সিমেন্ট, এক হাজার লিটার ডিজেল এবং একটি নৌযান জব্দ করা হয়েছিল। আটক ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে অধিক লাভের আশায় এসব পণ্য মিয়ানমারে নিয়ে যাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছিলেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে সরকার কৃষকদের জন্য ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করায় দেশের বাজারে এসব পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রিত থাকে। কিন্তু মিয়ানমারে যুদ্ধ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং আমদানি ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এসব পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা সীমান্তে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের শেষ দিকে আরাকান আর্মি বাংলাদেশ-সংলগ্ন মিয়ানমার সীমান্তের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বৈধ বাণিজ্য কমে গেলেও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ও চোরাচালানের প্রবণতা বেড়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তে মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচারের পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্য পাচারের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাচারকারীরা সাধারণত গভীর রাতে ছোট কার্গো নৌকা, স্পিডবোট ও মাছ ধরার ট্রলার ব্যবহার করে থাকে। উপকূলের নির্জন ঘাট থেকে এসব পণ্য তুলে নাফ নদী বা সমুদ্রপথে রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়। অনেক সময় বৈধ জেলেদের নৌযানও এই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও পাচারকারীরা নানা কৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। কখনও মাছ ধরার অজুহাতে, আবার কখনও নৌযানের ভেতরে বিশেষভাবে পণ্য লুকিয়ে তারা সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, মিয়ানমারে সার, ডিজেল, সিমেন্ট ও ওষুধ পাচারের মাধ্যমে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করা পণ্য এবং সরকারের ভর্তুকির অর্থ অপচয় হচ্ছে। এতে দেশের অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

পাচার বন্ধে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন উপকূলে সমন্বিত নৌ টহল বৃদ্ধি, সার ও সিমেন্টের সরবরাহ ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানো, সীমান্তঘাটে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার এবং পাচারকারী চক্রের অর্থের উৎস শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের আশঙ্কা, মিয়ানমারের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশ থেকে ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষি উপকরণ, নির্মাণসামগ্রী ও জ্বালানি পাচারের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *