নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকার গণপরিবহণ পরিকল্পনায় মেট্রোরেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে নির্মাণ ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। একই সঙ্গে মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
শুক্রবার ‘মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা’ শীর্ষক এক অনলাইন সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার মতো শহরে গণপরিবহণের অংশ হিসেবে মেট্রোরেলের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এটিকে সব সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। গত এক দশকে ঢাকার বাসব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি এবং বাস রুট রেশনালাইজেশনও কার্যকর করা যায়নি। অন্যদিকে মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্নের প্রস্তাবিত ব্যয় ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এই প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নের জন্য প্রস্তাবিত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্নের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ২ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। প্রকল্পগুলোর প্রতি কিলোমিটারের ব্যয়ের এই পার্থক্য নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে আইপিডি।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মেট্রোরেলের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ যোগাযোগব্যবস্থার অন্য সম্ভাবনাগুলোকে বাধাগ্রস্ত করছে। কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিদ্যমান রেলপথে দ্রুতগতির কমিউটার ট্রেন চালুর সুযোগ রয়েছে। একইভাবে কুড়িল থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত তুলনামূলক কম খরচে বিআরটি নির্মাণের সম্ভাবনাও যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
পরিবহণ পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ মুনতাসীর মামুন বলেন, বর্তমানে ঢাকার মোট যাত্রার প্রায় ১ শতাংশ মেট্রোরেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। পরিকল্পিত সব মেট্রোরেল বাস্তবায়িত হলেও সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ যাত্রা বহন করা সম্ভব হবে। ফলে অবশিষ্ট যাত্রার জন্য কার্যকর বাস ও অন্যান্য পরিবহণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ড. মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বড় প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, ঢাকায় একের পর এক মেগা প্রকল্প নেওয়া হলে মানুষ, ব্যবসা ও বিনিয়োগ আরও বেশি রাজধানীকেন্দ্রিক হতে পারে। এতে বিকেন্দ্রীকরণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংলাপে আইপিডি প্রতিটি মেট্রোরেল প্রকল্পের দরপত্র, চুক্তি, ব্যয়, সময়সীমা ও বাজেট সংশোধনের কারণ প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ব্যয় যাচাই, প্রকল্পের পরিচালন ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের হিসাব প্রকাশ এবং দেশীয় প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া বাস রুটগুলো ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় আনা, বিদ্যমান রেলপথে কমিউটার ট্রেন চালু এবং মেট্রো স্টেশনের সঙ্গে ফুটপাত, সাইকেলপথ ও ফিডার সার্ভিস যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে আইপিডি।
নতুন পরিবহণ প্রকল্প অনুমোদনের আগে মেট্রোরেলের পাশাপাশি বিআরটি, এলআরটি ও কমিউটার রেলের লাভ-ক্ষতি স্বাধীনভাবে বিশ্লেষণের দাবিও জানিয়েছে সংস্থাটি।