রাজউকের নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠছে বাবুই ফুটির ভবন

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজধানীর তুরাগ থানাধীন ধউর মৌজার গুলগুলার মোড়, তুরাগ পুরাতন থানা রোড সংলগ্ন এলাকায় “বাবুই ফুটির ভবন” নামে পরিচিত একটি বহুতল আবাসিক ভবনকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়ম, নকশা লঙ্ঘন এবং রাজউকের অনুমোদন অমান্য করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং সরেজমিন পর্যবেক্ষণে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভবনটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর অনুমোদিত নকশা এবং বিদ্যমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নির্মাণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ভবন মালিক আবুল কালাম আজাদ গংসহ একাধিক অংশীদার রাজউক উত্তরা জোন-১/১ এর অধীনে বেজমেন্ট ব্যতীত ১০ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন গ্রহণ করেন। যার নির্মাণ অনুমোদন স্মারক নং ২৫.৩৯.০০০০,০৯৯.৩৩.২৭৮.২১ এবং আর এস দাগ নং ৪১২/৪১২/৮৪৩। কিন্তু বাস্তবে নির্মাণকাজে অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির বিভিন্ন অংশে সেটব্যাক নিয়ম মানা হয়নি। অথচ বিদ্যমান ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি ভবনের সামনে কমপক্ষে ১.৫ মিটার, পেছনে ২.০০ মিটার এবং দুই পাশে ১.২৫ মিটার খালি জায়গা রাখা বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি রাস্তার কেন্দ্র থেকে ন্যূনতম ৪.৫ মিটার দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম থাকলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভবন নির্মাণের সময় রাস্তার জন্য নির্ধারিত জায়গাও দখল করা হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের ইজমেন্ট দলিল অনুযায়ী যে অংশ জনসাধারণের চলাচলের জন্য নির্ধারিত, সেটিও ভবন নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে এলাকার রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং যানবাহন চলাচলে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

রাজউক সূত্রে জানা যায়, অনুমোদিত নকশার বাইরে কোনো ধরনের নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ। নকশা ব্যত্যয় বা “ডেভিয়েশন” পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে নির্মাণ কাজ বন্ধ করার নির্দেশ, জরিমানা, আংশিক ভাঙা এবং প্রয়োজনে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই ভবনের ক্ষেত্রেও একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও তা উপেক্ষা করে নির্মাণ কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজউক কর্তৃপক্ষ কয়েক দফা লিখিত নোটিশ প্রদান করলেও ভবন মালিক পক্ষ সেই নির্দেশনা মানেনি। বরং নোটিশ পাওয়ার পরও নির্মাণকাজ আরও দ্রুত গতিতে চালিয়ে যাওয়া হয়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ভবন নির্মাণে শুধু সেটব্যাক লঙ্ঘন নয়, বরং ফ্লোর প্ল্যানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনুমোদিত নকশার চেয়ে প্রতিটি তলায় অতিরিক্ত নির্মাণ করা হয়েছে, যা ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

নির্মাণাধীন ভবনের চারপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয়রা ঝুঁকিতে রয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। নির্মাণ সামগ্রী এলোমেলোভাবে রাস্তায় ফেলে রাখা হচ্ছে, ফলে পথচারীদের চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

এ বিষয়ে ভবন মালিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, “আমরা রাজউক থেকে যেভাবে অনুমোদন পেয়েছি, সেভাবেই কাজ করছি। কোনো নিয়ম ভঙ্গ করা হয়নি।” তিনি আরও দাবি করেন, কিছু মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।

অন্যদিকে, রাজউকের এক ইমারত পরিদর্শক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভবনটির বিষয়ে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। তিনি স্বীকার করেন যে সরেজমিনে অনুমোদিত নকশার সঙ্গে নির্মাণ কাজের কিছু অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এ ধরনের নকশা লঙ্ঘন শুধু আইন ভঙ্গই নয়, বরং ভবিষ্যতে বড় ধরনের নগর বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে সেটব্যাক না রেখে নির্মাণ করলে অগ্নিকাণ্ডের সময় উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং ভবনের বায়ু চলাচলও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তারা আরও বলেন, ঢাকা শহরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে মানা অত্যন্ত জরুরি। না হলে ভবিষ্যতে জননিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের বারবার নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্রভাবশালী মহলের কারণে অনেক অবৈধ নির্মাণ বন্ধ হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমরা বারবার অভিযোগ করেছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। রাস্তা দখল হয়ে গেছে, এখন অ্যাম্বুলেন্সও ঢুকতে পারে না। ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনা ঘটলে দায় কে নেবে?”

এদিকে রাজউক কর্তৃপক্ষ রাজধানীতে অবৈধ নির্মাণ বন্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে বলে জানিয়েছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ডেভিয়েশনকৃত অংশ ভেঙে ফেলা, জরিমানা এবং সংযোগ বিচ্ছিন্নের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এসব অভিযান আরও কঠোর ও নিয়মিত হওয়া প্রয়োজন।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট ১৯৫২, টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৩, ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা ২০০৮, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০ এবং সংশোধিত ইমারত নির্মাণ আইন ২০০৮ অনুযায়ী এ ধরনের অনিয়ম ফৌজদারি অপরাধ হিসেবেও গণ্য হতে পারে। ফলে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজনে আইনগত শাস্তির ব্যবস্থাও গ্রহণ করা উচিত।

বর্তমানে “বাবুই ফুটির ভবন” ঘিরে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়রা দ্রুত রাজউকের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন এবং অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন সংশোধন বা অবৈধ অংশ অপসারণের দাবি জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এ ধরনের অনিয়ম যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে রাজধানীর পরিকল্পিত নগরায়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়বে।

এ অবস্থায় এখনই কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয়রা আশা করছেন, রাজউক কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *