লাকসাম প্রেসক্লাবে এমপির সিলমোহর, চতুর্থ স্তম্ভে হস্তক্ষেপের প্রশ্ন; আবুল কালামের দাবি, ‘ভালো উদ্দেশ্যেই অনুমোদন’

মোঃ আনজার শাহ

কুমিল্লার লাকসামে সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠন প্রেসক্লাবের কমিটি গঠনে সংসদ সদস্যের অনুমোদনের ঘটনায় সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। জনপ্রতিনিধির স্বাক্ষরে সাংবাদিক সংগঠনের কমিটি গঠনকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত সংগঠনের স্বায়ত্তশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সাংবাদিক নেতারা। তবে সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের দাবি, সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষার স্বার্থেই তিনি কমিটিটি অনুমোদন করেছেন।
ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন কুমিল্লা-৯ (লাকসাম–মনোহরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য এবং শিল্প মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালাম। সম্প্রতি তাঁর স্বাক্ষরিত একটি অনুমোদনপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে লাকসাম প্রেসক্লাবের পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি অনুমোদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুমোদনপত্রে যা বলা হয়েছে
প্রকাশিত অনুমোদনপত্রে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে লাকসামে একাধিক প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সংগঠন থাকায় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে ঐক্যের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার ফলে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ, স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত গণমাধ্যমকর্মীদের মান-মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে সংসদ সদস্যের নির্দেশে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে অনুমোদনপত্রে উল্লেখ করা হয়।
নবগঠিত কমিটিতে মুজিবুর রহমান দুলালকে সভাপতি এবং মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। কমিটির অন্যরা হলেন—তমিজ উদ্দিন আহম্মদ চুন্নু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক; সেলিম চৌধুরী হীরা, সাংগঠনিক সম্পাদক এবং এমএ জলিল, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক।
সাংবাদিক নেতাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর কুমিল্লার সাংবাদিক মহলে প্রতিক্রিয়ার ঝড় ওঠে। কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু ঘটনাটিকে ‘লজ্জাজনক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “একজন এমপি উপজেলা প্রেসক্লাবের কমিটি দিয়েছেন—এটা লজ্জাজনক। এটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের ওপর হস্তক্ষেপ। বিষয়টি সঠিক হলে আমি এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।”
সাংবাদিক নেতা আহমেদ আবু জাফের তাঁর ফেসবুক পোস্টে লেখেন, সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর অভিভাবক প্রতিষ্ঠান না থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মী জুয়েল খন্দকার তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে এ ঘটনার জন্য সাংবাদিকদের একাংশের ‘চাটুকারিতার চরিত্রকে’ দায়ী করেন।
সাংবাদিক নেতাদের মতে, প্রেসক্লাব কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় সংগঠন নয়; এটি সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত একটি প্রতিষ্ঠান। তাই এর কমিটি গঠনে জনপ্রতিনিধির অনুমোদন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
এমপির ব্যাখ্যা
সমালোচনার মুখে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম। তিনি বলেন, “আমার এলাকা হিসেবে আমি কমিটি দিয়েছি। আমি আইনপ্রণেতা হিসেবে নতুন এসেছি। দলের সঙ্গে কথা বলে এবং ঊর্ধ্বতনদের পরামর্শ নিয়েই এটি করেছি। আমি প্রেসক্লাবের প্যাডে কমিটি দিয়েছি; প্রেসক্লাব কোনো দলীয় সংগঠন নয়।”
এক প্রতিবেদকের সঙ্গে ফোনালাপে তিনি জানান, লাকসামে কয়েক দিন ধরে কোনো কমিটি না থাকায় সাংবাদিকেরা বিভিন্ন দিকে ছোটাছুটি করছিলেন। তিনি সবাইকে নিয়ে বসে নিজেদের মধ্যে কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে ঢাকার কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সঙ্গে আলোচনা করে অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চান।
তাঁদের পরামর্শেই নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য হিসেবে নিরপেক্ষভাবে কমিটিটি অনুমোদন করেছেন বলে দাবি করেন আবুল কালাম। অনুমোদনের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, “নির্বাচনী এলাকায় এই অনুমোদন তাহলে কে দেবে?”
‘নিয়ন্ত্রণের কোনো ইচ্ছা নেই’
কমিটি প্রত্যাহারের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য বলেন, “এখনই প্রত্যাহার করব কেন? যুক্তিসংগত ও আইনগত দিক থেকে কেউ বিষয়টি বিবেচনায় আনলে আমি তা বিবেচনা করতে পারি।”
তাঁর দাবি, কমিটি অনুমোদনের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই; সাংবাদিকদের কল্যাণ ও পেশাগত ঐক্যের কথা বিবেচনা করেই তিনি এ উদ্যোগ নিয়েছেন। আইনগত কোনো ত্রুটি থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সমাধানের পথে যেতেও তাঁর আপত্তি নেই বলে জানান তিনি।
সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ বা তাঁদের সংগঠনের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নাকচ করে আবুল কালাম বলেন, “সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই, ইনশাআল্লাহ করবও না।”
উত্তেজনা ও বিভক্তি অব্যাহত
এদিকে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে লাকসামের সাংবাদিকদের মধ্যে উত্তেজনা ও বিভক্তি অব্যাহত রয়েছে। কেউ কেউ সংসদ সদস্যের উদ্যোগকে সাংগঠনিক শূন্যতা পূরণের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলেও সাংবাদিকদের একটি অংশ এটিকে পেশাগত স্বাধীনতার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নজির বলে মনে করছেন।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সরাসরি সম্পৃক্ততায় সাংবাদিক সংগঠনের কমিটি গঠনের প্রবণতা ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত মর্যাদাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এ কারণে ঘটনাটির আইনগত ও সাংগঠনিক বৈধতা নিয়ে দ্রুত একটি স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশা করছেন সাংবাদিক মহলের অনেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *