মোঃ শামীম হোসেন সিকদার:
বান্দরবানের লামা উপজেলায় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে পাহাড় কাটার নির্মম বলি হয়েছেন আরও এক শ্রমিক। গতকাল উপজেলার একটি এলাকায় একটি ইটভাটার জন্য পাহাড়ের মাটি কাটতে গিয়ে ওপর থেকে বিশাল মাটির স্তূপ ধসে পড়লে চাপা পড়েন মো. সাইফুল ইসলাম (২৯) নামে এক যুবক। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত সাইফুল ইসলাম স্থানীয় বাসিন্দা বলে জানা গেছে। এই ঘটনার পর পাহাড়খেকো চক্রের কয়েকজন গা-ঢাকা দিলেও স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, লামার একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে বর্ষার আগে ইটভাটার জন্য ডাম্প ট্রাক দিয়ে পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নিচ্ছিল। প্রতিদিনের মতো গতকালও সাইফুলসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিক খাড়া পাহাড়ের তলদেশে মাটি কাটার কাজ করছিলেন। কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে মাটি কাটার একপর্যায়ে ওপরের অংশ ধসে পড়ে।
অন্য শ্রমিকরা দ্রুত সরে যেতে পারলেও সাইফুল মাটির নিচে সম্পূর্ণভাবে চাপা পড়েন। পরে সহকর্মী ও স্থানীয় লোকজন মাটির স্তূপ সরিয়ে তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।
বন্ধ হচ্ছে না পাহাড় কাটা
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুম থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত লামার বিভিন্ন পয়েন্টে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। ইটভাটার মালিকরা ও স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান—
“পাহাড়গুলো এমনভাবে খাড়া করে কাটা হয় যে যেকোনো সময় ধসের ঝুঁকি থাকে। গরিব শ্রমিকদের টাকার লোভ দেখিয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামিয়ে দেওয়া হয়, আর মরলে লাশ হয় তারা।”
প্রশাসনের বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপ
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে লামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, “খবর পেয়েই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করেছে। পাহাড় কাটার সাথে জড়িত এবং ইটভাটার মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার পর থেকে দায়ীরা পলাতক রয়েছে, তবে তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”
পরিবেশবাদীরা বলছেন, কেবল দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখে এই মৃত্যুকে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট বা সাময়িক জরিমানা যথেষ্ট নয়; বরং স্থায়ী ও কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে বান্দরবানের পাহাড় ও মানবজীবন—দুই-ই চরম ঝুঁকিতে থাকবে।