লাল পতাকায় ছেয়ে গেল খামেনির দাফন, প্রতিশোধের বার্তা দেখছেন বিশ্লেষকেরা
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন অনুষ্ঠান ঘিরে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে তেহরানে। এ সময় শোকাহত মানুষের হাতে বিপুলসংখ্যক লাল পতাকা দেখা যায়, যা দেশটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পতাকা নিহত নেতার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার দাবিরই প্রতিফলন।
খামেনির জানাজা ও দাফন উপলক্ষে রাজধানী তেহরানে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ইরান। একই সঙ্গে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সতর্ক করে জানিয়েছে, অনুষ্ঠান চলাকালে যেকোনো ধরনের হামলার জবাব কঠোরভাবে দেওয়া হবে।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ এসলামির মতে, খামেনির দাফন অনুষ্ঠানে লাল পতাকার ব্যাপক উপস্থিতি কেবল শোকের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি প্রতিশোধের প্রতীক।
তার ভাষায়, যারা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বানই এসব পতাকার মাধ্যমে জানাচ্ছেন সমর্থকেরা। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত খামেনি শুধু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন না, তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লব ও রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান প্রতীকও ছিলেন।
দাফন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য দেশজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে ইরান সরকার। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইএসএনএর তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ হাজারের বেশি স্কুল এবং প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার শ্রেণিকক্ষ অস্থায়ীভাবে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিতে পারেন।
এ ছাড়া ইরানের দাবি, খামেনির দাফন অনুষ্ঠানে বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রতিনিধি এবং লাখো মানুষ অংশ নিচ্ছেন, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
খামেনি কে ছিলেন?
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শিয়া নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময় তিনি রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে পরিচিতি পান।
১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ সময় দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন।
তার নেতৃত্বে ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়। পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং বহিরাগত হুমকি মোকাবিলায় দেশটির প্রতিরক্ষা কৌশলও নতুন মাত্রা পায়।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনি নিহত হন। তার মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পরও তিনি এখনো জনসমক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থিত হননি।
খামেনির দাফন অনুষ্ঠান শুধু একটি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান নয়, বরং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থানের প্রতীক হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে লাল পতাকার ব্যাপক উপস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের বার্তা হিসেবে দেখছেন।
সূত্র: আল জাজিরা