স্টাফ রিপোর্টার:
সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ঢাকার আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে একটি শক্তিশালী ঘুষ ও দুর্নীতি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। অফিসের নায়েব (ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা) নাসিরউদ্দিন ও তার আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত একটি দালাল চক্রের যোগসাজশে প্রতিদিন হয়রানির শিকার হচ্ছেন শত শত সেবাগ্রহীতা—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নামজারি, জমাভাগ, খাজনা পরিশোধ কিংবা পর্চা উত্তোলন—ভূমি অফিসের নিয়মিত সেবা পেতে দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষকে একদিকে যেমন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে, অন্যদিকে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ।
সরেজমিনে ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ১৫০ টাকার নামজারি ফির পরিবর্তে দালাল চক্রের পক্ষ থেকে সর্বনিম্ন ৬ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভূমি অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের অভিযোগ, অফিসের নায়েব নাসিরউদ্দিনের সহযোগী হিসেবে পরিচিত কাওসার নামের এক ব্যক্তি এই চক্রের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কাওসারসহ কয়েকজন দালাল অফিসে আসা সেবাগ্রহীতাদের বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেন। জমি সংক্রান্ত কোনো কাজ নিয়ে কেউ অফিসে প্রবেশ করলেই তার পিছু নেন চক্রের সদস্যরা। পরে সরকারি প্রক্রিয়ার কথা বলে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। দালালের মাধ্যমে চুক্তি করলে কাজ দ্রুত সম্পন্ন হলেও সরাসরি অফিসে গিয়ে সেবা নিতে গেলে নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, নায়েব নাসিরউদ্দিনকে পুনরায় শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করে আনার ক্ষেত্রে প্রায় ১০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে। তবে এ অভিযোগের কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, নায়েবের সঙ্গে দালাল চক্রের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে অফিসে তাদের প্রভাব দিন দিন বেড়েছে। বর্তমানে এই অফিসকে কেন্দ্র করে প্রতি মাসে অন্তত ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বলেও স্থানীয় কয়েকজন দাবি করেছেন।
ভূমি অফিসের মূল ফটকের বাইরে এবং আশপাশে দালালদের নিজস্ব ‘চেম্বার’ গড়ে ওঠার অভিযোগও রয়েছে। কোনো সেবাগ্রহীতা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে অফিসে এলেই দালাল চক্রের সদস্যরা তাকে ঘিরে ধরেন বলে অভিযোগ। তাদের মধ্যে কাওসার, মনির, ইমরান, জনি, মান্নান, শাজাহান, স্বপন, সজল, শাকিল ও রুমন নামে কয়েকজনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো, ভুল বুঝিয়ে টাকা নেওয়া এবং কাজ করে দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, জনি নামের এক ব্যক্তি নিয়মিত অফিসের ভেতরে বসে ফাইলপত্র নাড়াচাড়া করেন। এমনকি তিনি কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত চেয়ারে বসেও দাপ্তরিক কাজের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ। এ ক্ষেত্রে অফিসের নায়েবের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাধা বা নজরদারি করা হয় না বলেও স্থানীয়দের দাবি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোনো সেবাগ্রহীতা সরাসরি নায়েবের কাছে গিয়ে নিজের জমি সংক্রান্ত সমস্যার কথা জানালে নানা অজুহাতে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কখনো ফাইল আটকে রাখা, আবার কখনো জটিল ওয়ারিশ সনদ বা অতিরিক্ত কাগজপত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে হয়রানি করা হয়। অথচ একই কাজ দালালের মাধ্যমে চুক্তি করলে দ্রুত সমাধান পাওয়া যায় বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
ভুক্তভোগী মোয়াজ্জেমের অভিযোগ, জমি সংক্রান্ত একটি সমস্যা নিয়ে তিনি শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গেলে এক দালাল তাকে সরাসরি জানান, নায়েব নাসিরউদ্দিনকে ১ লাখ টাকা দিলে তার কাজটি সমাধান করে দেওয়া হবে। এ ঘটনায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
অন্য এক ভুক্তভোগী নিরব অভিযোগ করে বলেন, একটি সাধারণ কাজের জন্যও তার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল। প্রয়োজনীয় অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কাজ না করেই তাকে ফিরে আসতে হয়েছে।
ডেন্ডাবর এলাকার এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও নায়েব সরাসরি ফাইল জমা নেন না। দালাল ধরলেই সব সহজ হয়ে যায়।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে নিয়মিতভাবেই দালালদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি সরকারি ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া নায়েব নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তিনি দীর্ঘদিন একই পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি একই জায়গায় বহাল রয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অন্যদিকে, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় নথি দালালদের হাতে তুলে দেওয়া এবং অফিসের কার্যক্রমে তাদের অবাধ বিচরণের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, অফিসের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যার দিকে নায়েব ও দালালদের মধ্যে অবৈধ অর্থ ভাগাভাগি হয়। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে দালালমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব নাসিরউদ্দিনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম তদন্ত করে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করবে এবং সরকারি নির্ধারিত ফি অনুযায়ী হয়রানিমুক্ত ভূমিসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।